মঙ্গলবার, ১৯ জানুয়ারি, 2০২1
অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র বিপন্ন হলে বহির্জগতে নেতৃত্ব হারাবে আমেরিকা
আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী
Published : Saturday, 7 November, 2020 at 8:13 PM

এই প্রবন্ধটি আমি যখন লিখছি, তখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন অনেকটাই এগিয়ে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট লাভে ট্রাম্পের ভোটের চাইতে তিনি খুব বেশি ভোট পাননি। তবে জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হওয়ার কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। আমার এ লেখাটি যখন পাঠকদের চোখে পড়বে, তখন তারা জেনে যাবেন কে পরবর্তী চার বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। আমার ধারণা, জো বাইডেনই আমেরিকার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট। যদি তাকে হতে না দেওয়া হয়, সেটা হবে আমেরিকায় গণতন্ত্রের জন্য সবচাইতে বড় ট্র্যাজেডি।
ডোনাল্ড ট্রাম্প সহজে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চাইবেন তা মনে হয় না। ব্যক্তিগত শালীনতা, রাজনৈতিক ভব্যতা কোনোটাই তার নেই। তিনি যে নির্বাচনে পরাজিত হলেও ক্ষমতা ছাড়তে চাইবেন না, সে কথা আগেই বলে রেখেছিলেন। নির্বাচনে কারসাজির বহু ব্যবস্থা তিনি করে রেখেছিলেন। হোয়াইট সুপ্রিমেসিতে বিশ্বাসী সন্ত্রাসীরা আগেই তাদের সমাবেশ থেকে ঘোষণা দিয়েছে, ট্রাম্পকে তারা সশস্ত্র ক্ষমতাবলে হোয়াইট হাউসে রাখবে। অর্থাৎ, দেশে সিভিল ওয়ার বাধাবে।
ট্রাম্প নিজেরা যা কারসাজি করেছেন, তা হলো ডাক বিভাগের প্রধানের পদে নিরপেক্ষতার নীতি ভেঙে নিজের এক অনুচরকে বসিয়েছেন। কারণ, ডাকযোগে কোটি কোটি ভোটার ভোট দেন। এবার করোনার কারণে আরও বেশি ভোটার ডাকযোগে ভোট দিয়েছেন। এই ভোট গণনা যাতে বিলম্বিত হয় এবং নানা অজুহাতে হাজার হাজার ভোট বাতিল ঘোষণা করা হয়, তার চেষ্টা তিনি করছেন। তারপর বাইডেনের পক্ষে প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা যদি তার চাইতে খুব বেশি না হয়, তাহলে বাইডেনের বেশি ভোট পাওয়া নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে সিদ্ধান্তের জন্য সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হবেন। সুপ্রিম কোর্ট যাতে তার পক্ষে রায় দেন সেজন্য সুপ্রিম কোর্টের বিচারক পদেও তিনি তার অনুচরদের বসিয়ে রেখেছেন।
ট্রাম্প এতকিছু করার পরও বাইডেন জয়ী হতে চলেছেন এই আভাস পেয়ে আমেরিকার হাজার হাজার মানুষ বাইডেনের পক্ষে স্লোগান দিয়ে রাজপথে নেমে এসেছে আর ট্রাম্পও নতুন কারসাজি শুরু করেছেন। তার সমর্থকরা রাজপথে সন্ত্রাস সৃষ্টির চেষ্টা করছে। পুলিশ দেড়শ ব্যক্তিকে ইতোমধ্যেই গ্রেপ্তার করেছে। তারা কোন দলের লোক বলা হয়নি। ট্রাম্প শিবির চারটি রাজ্যে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি বলে অভিযোগ করে মামলা করেছে। তাদের অভিযোগ, কোনো কোনো রাজ্যে তাদের পোলিং এজেন্টদের ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এই সঙ্গে আরও নানা অভিযোগ। কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলেছেন, কোনো রাজ্যেই ভোটকেন্দ্রে বা ভোটদানে কোনো অনিয়ম হয়নি। এগুলো ট্রাম্প শিবিরের মনগড়া অভিযোগ।
আমেরিকায় গণতন্ত্রের যে সাংবিধানিক শক্ত ভিত্তি তাতে মনে হয় না ট্রাম্প শিবির মিথ্যা অভিযোগ তুলে অথবা কারসাজি করে জো বাইডেনের জয়লাভ ঠেকাতে পারবে। আমার লেখাটি পাঠ করার সময় 'কালের আয়নায়' কলামের পাঠকরা নিশ্চয়ই পরবর্তী আমেরিকার প্রেসিডেন্টের নামটি জেনে যাবেন। সে নামটি নিশ্চয়ই হবে জো বাইডেন।
তা যদি না হয়, জর্জ বুশের মতো সুপ্রিম কোর্টের পক্ষপাতপূর্ণ রায়ে যদি ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে আরও চার বছরের জন্য থেকে যান, তাহলে তা হবে আমেরিকার ইতিহাসের সবচাইতে লজ্জাজনক অধ্যায়। ট্রাম্প এখন আমেরিকার সাধারণ জনগণের মধ্যে এতই আনপপুলার যে, তাকে জেতানোর পক্ষে সুপ্রিম কোর্ট রায় দিলে এবার সেই রায় কেউ মানবে না। বাইডেনের পক্ষের লক্ষ লক্ষ সাদা ভোটার রাস্তায় নামবে। তাছাড়া এটা 'ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার' শীর্ষক উত্তাল আন্দোলনের বছর। এই গণআন্দোলনে বাধা দিতে গেলে সিভিল ওয়ার শুরু হতে পারে। আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র পদ্ধতি ভেঙে যেতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্প উগ্র শ্বেতাঙ্গ সমর্থকদের সমর্থনে চার বছর হোয়াউট হাউসে নিশ্চিন্তে কাটাতে পারবেন, সে আশায় গুড়েবালি।
আমেরিকায় অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র বিপন্ন হলে গণতান্ত্রিক বহির্জগতে তার শক্তিশালী নেতৃত্ব সম্পূর্ণ ধ্বংস হবে। বিশ্বের দ্বিতীয় সুপার পাওয়ার সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ধ্বংসাবশেষের ওপর কিছুদিন রাজত্ব করে ইয়ালতসিনকে যেমন লজ্জাকর পথে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল, ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও সেই পথ অনুসরণ করতে হবে। আর সবচাইতে মজার কথা, যে আমেরিকা গণতান্ত্রিক বিশ্বের অভিভাবক বলে পরিচয় দেয়, অন্য দেশে গণতন্ত্র কীভাবে চলবে তার 'ছবক' দেয়, অন্য দেশে নির্বাচন স্বচ্ছ হয়েছে, না হয়নি তার সার্টিফিকেট দেয়, তাদের অনুগত রেজিম কোনো দেশে নির্বাচনে ক্ষমতায় না এলে জনগণের পছন্দের সরকারকে উৎখাতের জন্য তাদের পোষা সুশীল সমাজ ও সিআইএ এজেন্টদের উস্কে দেয়, আজ সেই আমেরিকাতেই অস্বচ্ছ নির্বাচন, নির্বাচনে কারচুপি এবং ভোটকেন্দ্রে একটি দলের পোলিং এজেন্টদের ঢুকতে না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচনী হাঙ্গামায় পুলিশ এশিয়া-আফ্রিকার দেশগুলোর মতো হাঙ্গামাকারীদেরও গ্রেপ্তার করেছে। এই অবস্থায় বাংলাদেশে স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের সোল এজেন্ট আমাদের সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু হয়েছে কিনা তা দেখার জন্য একটি পর্যবেক্ষক টিম কেন পাঠানো হলো না, সেটাই আশ্চর্য!

ইতোমধ্যে একটি রাজ্যের আদালত ট্রাম্প ভোট জালিয়াতির যে মামলা করেছিলেন, তা খারিজ করে দিয়েছেন। আমেরিকান মিডিয়াই বলছে, ট্রাম্প তার গত বৃহস্পতিবারের বক্তৃতাতেও যে ভোট জালিয়াতির অভিযোগ তুলেছেন, তার একটির পক্ষেও কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি। এ অবস্থায় তিনি সুপ্রিম কোর্টে গেলেও তার নিজের পছন্দে নিযুক্ত করা বিচারকরা তার পক্ষে কতটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবেন, তাতে সন্দেহ আছে।
সবচাইতে মজার ব্যাপার, ট্রাম্প তার নিজের প্রশাসনের বিরুদ্ধেই ভোটে কারসাজি করার অভিযোগ তুলছেন। এমন ঘটনা একবার ঘটেছিল পাকিস্তান আমলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) প্রাদেশিক নির্বাচনে। ১৯৫৪ সালে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের নূরুল আমিন সরকার হক-ভাসানীর যুক্তফ্রন্টের কাছে বিপুল ভোটে পরাজিত হয়। যুক্তফ্রন্টের কাছে পরাজিত মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিন তার নিজের প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন যে, তারা নির্বাচনে কারসাজি করে তার পরাজয় ঘটিয়েছে। এটা যেন নিজের বিরুদ্ধে নিজের অভিযোগ। দীর্ঘকাল পর আমেরিকার মতো একটি সুপারপাওয়ারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজয়ের আশঙ্কায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন এবং নিজের প্রশাসনের বিরুদ্ধেই নিজে অসত্য অভিযোগ তুলেছেন এবং দুনিয়ার মানুষকে হাসাচ্ছেন।
কিন্তু জনগণের ভোটে ট্রাম্প যদি হারেন, তা হলে এশিয়া-আফ্রিকার দুর্বল গণতান্ত্রিক দেশগুলোর স্বেচ্ছাচারী শাসকদের মতো বন্দুকের জোরে ভোটের রায় উল্টে দিয়ে ক্ষমতায় কি থাকতে পারবেন? আমার তা মনে হয় না। আমেরিকার গণতন্ত্রের মূল শক্তি তার সংবিধান। এই সংবিধানের মর্যাদা কোনো কোনো প্রেসিডেন্ট (যেমন নিক্সন, বুশ জুনিয়র, ট্রাম্প) নষ্ট করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু লঙ্ঘন করতে সাহসী হননি। সুযোগ পাননি। পাকিস্তানে, বাংলাদেশে জিয়াউর রহমান, এরশাদের মতো স্বৈরাচারী সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন, তাতে বেআইনি ছাঁটকাট করেছেন। কখনও কখনও ব্যক্তি ইচ্ছায় সংবিধান পাল্টে ফেলেছেন। আমেরিকার জনগণ এই ঘটনাটি ঘটতে দেয়নি। তারা সংবিধানের পবিত্রতা ও মর্যাদা রক্ষা করেছেন এবং সংবিধান তাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়েছে। আমাদের দেশের সুশীল সমাজের মতো আমেরিকায় সুশীল সমাজের বিরাট অংশই স্বৈরাচারের কাছে বশ্যতা স্বীকার করেননি এবং সংবিধানের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হতে দেননি। আমাদের সুশীল সমাজ স্বৈরাচারের হাতে সংবিধানের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হতে দিয়েছেন। বাইরে গণতন্ত্র চাই, গণতন্ত্র চাই বলে বলে চিৎকার জুড়েছেন।
বিশ্ববাসীর সঙ্গে আমিও আশা করি জো বাইডেন আমেরিকার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হবেন। যদি তিনি না হন, তাহলে তা হবে আমেরিকার বিরাট দুর্ভাগ্য। ট্রাম্পের চাইতে জো বাইডেন অনেক ভদ্র, বিবেচক, স্থির মস্তিস্কের লোক। তিনি প্রেসিডেন্ট হলে আর কিছু না পারুন, বিশ্বের একটা ভারসাম্যমূলক স্থিতাবস্থা রক্ষার চেষ্টা করতে পারবেন। তবে তার কাছ থেকে বেশি আশা করা ঠিক হবে না। ওবামা শুধু আমেরিকার মানুষকে নয়, সারাবিশ্বের মানুষের মনে অনেক প্রত্যাশা সৃষ্টি করেছিলেন। আমেরিকার হোয়াইট এস্টাবলিশমেন্টের সঙ্গে যুদ্ধ করে তিনি তার কতটুকু সফল করতে পেরেছিলেন? জো বাইডেন পারবেন, তা আশা করা বাতুলতা। তবে ট্রাম্পের বদলে বাইডেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হলে বিশ্বের ভাগ্যনিয়ন্তা একজন শান্ত স্বভাবের স্থির মস্তিস্কের লোক হয়েছেন, এটা ভেবে বিশ্ববাসী স্বস্তি পাবে। ট্রাম্প আবার প্রেসিডেন্ট হলে বিশ্ববাসীর সেই স্বস্তি থাকবে না।


সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি