শুক্রবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০১৮
বছরের শেষ ও শুরুতে শিক্ষার্থীদের শঙ্কা
Published : Sunday, 31 December, 2017 at 6:59 PM

বছরের শেষ ও শুরুতে শিক্ষার্থীদের শঙ্কাগত ১৮ ডিসেম্বর নাটোরে প্রথম শ্রেণির প্রশ্ন ফাঁস হয়। এ খবরটি একটি জাতির জন্য কতটা কলঙ্কজনক, তা সবার উপলব্ধিতেই থাকার কথা।
তবুও কোনো না কোনো অভিভাবক তাঁর শিশুসন্তানের হাতে এই ফাঁস হওয়া প্রশ্নটি হয়তো তুলে দিয়েছিলেন। সংগত কারণেই যারা প্রশ্ন ফাঁস করেছে তারা যেমন অপরাধী, পাশাপাশি প্রশ্নটি যাঁরা তাঁর সন্তানের হাতে দিয়েছিলেন তাঁরাও সমভাবে অপরাধী। আমরা জানি, শিক্ষার্থীদের জন্য বছরের শেষ ও শুরু দুটিই খুব গুরুত্বপূর্ণ। বছরের শেষে বার্ষিক পরীক্ষা, পরীক্ষার ফলাফল, ভর্তি পরীক্ষা—প্রভৃতি মিলে সব স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বিশেষ সময়। আর বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হওয়া এবং সে কারণে পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি যে কতটা ক্ষত সৃষ্টি করে সেটি আমাদের বুঝতে বাকি নেই।
বছরের শেষটা যেমন, তেমনি নতুন বছরের শুরুটাও থাকে শিক্ষার্থীদের জন্য ভিন্ন এক ফ্লেভার। শিক্ষার্থীরা নতুন বই এবং ক্ষেত্র বিশেষে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পেয়ে অনেক আনন্দিত ও উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। উল্লেখ্য, প্রায় আট বছর ধরে বছরের প্রথম দিন শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে ‘পাঠ্যপুস্তক উৎসব’ উদ্যাপন করা হয়। বরাবরের মতো ২০১৮ সালের শুরুতেও পাঠ্যপুস্তক বিতরণ ও ভর্তি শুরু হতে যাচ্ছে।
২০১৮ সালের প্রথম দিনে ৩৫ কোটি ৪২ লাখ ৯০ হাজার ১৬২টি পাঠ্য বই বিনা মূল্যে সারা দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। তবে এ ক্ষেত্রে সবারই প্রত্যাশা এ বছরের (২০১৭) শুরুর মতো কোনো অনিয়ম কিংবা অভিযোগের কথা যেন না শুনি। বিশেষ করে পাঠ্যপুস্তক বিতরণে অর্থ আদায় এবং নামিদামি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তিতে উচ্চ হারে মাসিক বেতন ও ফি আদায়ের অভিযোগটি প্রায়ই শোনা যায়। আবার পাঠ্যপুস্তকের ভুলভ্রান্তিও আমাদের চরমভাবে ব্যথিত করে তোলে। অভিযোগগুলো অতি ব্যাপক আকারে না হলেও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট হওয়ায় সাধারণ মানুষের মনে তা বিশেষ দাগ কাটে।
শিক্ষা নিয়ে এবং প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে প্রতিনিয়ত প্রতিটি মহল অতি পরিমাণ উদ্বিগ্ন থাকলেও এর চূড়ান্ত সমাধানের দায়িত্বটি কেউ নিতে পারছে না কেন—সেটি এক বড় প্রশ্ন। শিক্ষামন্ত্রী, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং ক্ষেত্র বিশেষে আদালতের হস্তক্ষেপেও এই সমস্যার সমাধান হাতে ধরা দিচ্ছে না। বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যেখানে শিক্ষা ক্ষেত্রে অনিয়ম দূর করতে দুদককে মাথা ঘামাতে হয়। আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃক আদায়কৃত বিভিন্ন ধরনের ফি নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে নানা ক্ষেত্রে আদালতের রুলনিশি জারি করতে হয়। কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও কি সমস্যার সমাধান প্রত্যাশা করা যাচ্ছে? তাহলে এসবের ব্যর্থতা কার? গত বেশ কিছুদিন থেকে শিক্ষামন্ত্রী প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়ে শিক্ষকদের অভিযুক্ত করে আসছেন। শিক্ষামন্ত্রীর এই বক্তব্যের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই একমত হওয়া গেলেও বেশ কিছু প্রশ্ন তৈরি হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
আমরা প্রায়ই শিক্ষা নিয়ে নানা রকম উন্নয়ন ও সংস্কারের কথা শুনে থাকি কিংবা বলে থাকি। ২০১০ সালের শিক্ষানীতি অনুযায়ী শিক্ষা আইন প্রণয়নের কথা থাকলেও আজ পর্যন্তও তা সম্ভব হয়নি। বেশ কয়েকবার এ বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করলেও তা চূড়ান্ত রূপ পায়নি। এ বছরের শুরুর দিকে সরকার আবার শিক্ষা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করলেও সেটি আদৌ আলোর মুখ দেখবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কা আছে। এ ছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রায়ই বিভিন্ন ধরনের নির্দেশ কিংবা পরিপত্র আমাদের চোখে পড়ে। কিন্তু সেগুলোর কার্যকারিতা আদৌ কি আমরা দেখেছি? গত ১৯ নভেম্বর প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) পরীক্ষার প্রথম দিনেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ পাওয়া যায়। ওই অভিযোগ আমলে নিয়ে এখন পর্যন্তও কি কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে?
খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, পরীক্ষায় নকলের ছড়াছড়ি আমাদের ভাবিয়ে তুলেছিল। এখন তা বন্ধ হয়েছে। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মধ্য দিয়ে আমাদের সেই পুরনো শঙ্কা আরো ভয়াবহতা পেয়েছে। এখন আর শুধু ব্যক্তি শিক্ষার্থী নয়, এখন এই সর্বনাশা প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে রাজনৈতিক চক্র এবং শিক্ষক-অভিভাবকদেরও অনেকে। শিক্ষামন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চ মহল এ বিষয়ে বিশেষ সরব থাকলেও প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে আজ পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হয়ে ওঠেনি। কিন্তু কেন তা সম্ভব হচ্ছে না?
গত ১৬ নভেম্বর মহান জাতীয় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী ক্ষোভের সঙ্গে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ শিক্ষকদের ঘাড়ে চাপিয়ে গোটা জাতিকে অসহায় করে তুলেছেন। যিনি এ বিষয়টি রোধ করবেন তিনিই যদি ক্ষোভ প্রকাশ করেন, তাহলে এর প্রতিকার কে করবে? প্রতিকারের সংকটে আজ আমরাই ক্ষোভ প্রকাশ করছি। উল্লেখ্য, শিক্ষকদের ঢালাও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে অভিযুক্ত করার বিষয়টি কোনোভাবেই মানানসই নয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রতিবছরই ভর্তি পরীক্ষা থেকে শুরু করে বিভিন্ন একাডেমিক পরীক্ষা হয়ে থাকে। কিন্তু দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া কখনো কি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর আমরা পাই? এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের গর্বিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে যে কোনো ধরনের প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা তো দূরে থাক, এ বিষয়ে সামান্যতম অভিযোগের খবরও আমরা পাই না। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ভর্তি পরীক্ষায় লাখ লাখ শিক্ষার্থীর পরীক্ষা নেওয়া হয়ে থাকে। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকেন শিক্ষকরা। প্রশ্নপত্র প্রণয়ন থেকে শুরু করে প্রতিটি ধাপে শিক্ষকরা যুক্ত থাকেন। এমনকি পরীক্ষা নেওয়ার লক্ষ্যে কক্ষে দায়িত্বরত শিক্ষকদের হাতে আধা ঘণ্টা আগেই প্রশ্নপত্র সরবরাহ করা হয়। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের মাধ্যমে কখনোই প্রশ্নপত্র ফাঁসের কোনো অভিযোগ পাওয়া যায় না। তাহলে অন্যান্য পাবলিক পরীক্ষা কিংবা চাকরির পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস কেন হচ্ছে? তাহলে কি শুধু শিক্ষকরাই দায়ী? নাকি অন্য কোনো রহস্য রয়েছে?
এ বিষয়গুলো এখন খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। এসবের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে শিক্ষা কার্যক্রম সম্পূর্ণটাই মুনাফাভিত্তিক হয়ে ওঠার পাশাপাশি নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করবে। বিশেষ করে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ, শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে অনিয়ম, পাঠ্যপুস্তক বিতরণে অনিয়ম, ভর্তি ফি ও বেতন বৃদ্ধির মাধ্যমে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি প্রভৃতি রোধ করতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।




সম্পাদক : জয়নাল হাজারী। ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯, ০১৭৫৬৯৩৮৩৩৮
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আইন উপদেষ্টা : এ্যাডভোকেট এম. সাইফুল আলম। আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি