শুক্রবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০১৮
ইংরেজি নববর্ষের বাংলাদেশি ভার্সন
তানভীর আহমেদ
Published : Monday, 1 January, 2018 at 8:11 PM

 ইংরেজি নববর্ষের বাংলাদেশি ভার্সনব্রিটেনে সরকারি অর্থায়নে ইংরেজি নববর্ষ উদযাপন ছাড়াও চাইনিজ নিউ ইয়ার ও বাংলা নববর্ষ উদযাপন করা হয়। ইংরেজ জাতি তাদের নতুন বছরকে বরণ করে নিতে অর্থ খরচ করবে রাষ্ট্রীয়ভাবে এটিই তো স্বাভাবিক। কিন্তু বৈশাখী মেলা উদযাপন ও চাইনিজ নিউ ইয়ার উৎসব পালনে ব্রিটিশ সরকারের অর্থায়নের বিষয়টি নিয়ে সাধারণ ব্রিটিশদের মনে প্রশ্ন জাগে না কারণ ব্রিটিশরা মনে করে মিশ্র সংস্কৃতির এ ব্রিটেনে বাংলা এবং চায়নিজ নববর্ষ উদযাপনও এখন ব্রিটিশ সংস্কৃতির অংশ।
বৈশাখী মেলাকে ঘিরে বাংলা টাউন আর চায়না টাউনে যে অনুষ্ঠান হয়, তাতে বাঙালি ও চাইনিজদের পাশাপাশি শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ ও মিশ্র সংস্কৃতির মানুষের অংশগ্রহণও চোখে পড়ে সমানভাবে। বাংলা নববর্ষ উদযাপনের অন্যতম আকর্ষণ যেমন মঙ্গল শোভাযাত্রা তেমনি ইংরেজদের নতুন বছর উদযাপনের অন্যতম আকর্ষণ হলো আতশবাজি প্রদর্শনী। ইংল্যান্ডের নববর্ষ উৎসবের জন্য ৩১ ডিসেম্বর রাত ১২টায় লাখ লাখ দর্শনার্থী টেমস নদীর তীরে ভিড় জমায় লন্ডন আই'র আতশবাজি প্রদর্শনী দেখার জন্য।
প্রশাসনকে যেমন যে কোন উৎসবকে তার নিজস্ব ঢঙে চলতে দিতে হবে, তেমনি নাগরিক হিসেবে মেট্রোপলিটন সিটিতে বসবাস করে আমরা যদি কসমোপলিটন সিটির সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য উপভোগ করতে চাই তাহলে আমাদেরকে কসমোপলিস সৌজন্যতায়ও অভ্যস্ত হয়ে উঠতে হবে।
লন্ডনে আসার পর আমি কমপক্ষে ৭-৮ বার এ আতশবাজি প্রদর্শনী দেখতে গেছি। এ আতশবাজি প্রদর্শনী দেখতে দর্শনার্থীরা সন্ধ্যা থেকেই জড়ো হতে থাকে লন্ডন আই-এর সামনে। ১৫ মিনিটের আতশবাজি প্রদর্শনী শেষ হওয়ার পর দুই ঘণ্টার মধ্যেই টেমস নদীর তীর আবারো খালি হয়ে যায়। ধারণাই করা যাবে না এতো অল্প সময়ে লাখ লাখ মানুষ কেমন সুশৃঙ্খলভাবে বাড়ি ফিরে যায়। দর্শনার্থীদের মধ্যে অনেকেই সঙ্গে করে অ্যালকোহল নিয়ে আসেন, নদীর তীরে দাঁড়িয়েই অ্যালকোহল পান করেন। কিন্তু আমি খুব সতর্কভাবে খেয়াল করেছি, অধিকাংশ মানুষই খালি হয়ে যাওয়া মদ বা বিয়ারের বোতল তার সঙ্গে রাখা পলিথিন ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখছেন, ফেরার পথে ডাস্টবিনে ফেলছেন। কিছু কিছু তরুণ হয়তো বিয়ারের ক্যান পথে ফেলছে, তবে সেই সংখ্যা খুব কম। অ্যালকোহল খেয়ে কোনো তরুণীর গায়ে লুটিয়ে তার শ্লীলতাহানির চেষ্টা করছে তরুণরা এমন দৃশ্য গত এক যুগে লন্ডনে চোখে পড়েনি আমার।
এবার বাংলাদেশের ইংরেজি নববর্ষের অভিজ্ঞতার কথা বলি। ১৯৯৯ সালের কথা, আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। মধ্যরাতে টিএসসিতে যোগ দিয়েছি নববর্ষ উদযাপন করতে। টিএসসিতে মধ্যরাতে কোনো অনুষ্ঠান নেই, তবুও আমারা টিএসসিতে জড়ো হয়ে এদিক সেদিক ছুটোছুটি করছি। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ রোকেয়া হলের গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে মেয়েদের ডাকছে, কেউ শামসুন্নাহার হলের সামনে থেকে মেয়েদের নানা ভাষায় ইশারা করে ডাকছে! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলেদের হলে ফিরে যাওয়ার কোনো বিধি-নিষেধ না থাকলেও মেয়েদের ফিরতে হতো রাত ১০টার আগেই। তাই ছেলেরা টিএসসিতে অবাধে মধ্যরাতে থাকার সুযোগ পেলেও মেয়েরা পেতো না।
তবে সেইদিন আমারও একটা ধারণা হয়ে গিয়েছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকা শিক্ষার্থীদের কারো কারো ইংরেজি নববর্ষ পালন মানে টিএসসিতে গিয়ে মদ খাওয়ার অভিনয় করা আর হলের সামনে গিয়ে মেয়েদের বিভিন্ন ভাষায় ইঙ্গিত করে ডাকা। ঘড়ির কাঁটা রাত ১২টা এক মিনিটে পৌঁছানোতেই কেউ কেউ পটকা ফোটালো, কেউ ককটেল। আর হলগুলোতে যে সব ক্যাডারদের দেশি অস্ত্র থাকতো তারা ইংরেজি নববর্ষের রাতে, অস্ত্র দিয়ে ফাঁকা গুলি ছুড়ে নতুন বছর উদযাপন করতো। যাই হোক, সেই দিন টিএসসিতে হঠাৎ চিৎকার আর হৈ হুল্লোড় শুরু হলো। রাজনৈতিক দলের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ভেবে টিএসসি ত্যাগ করে আমরা হলে ফিরে যাই। পরদিন সকালে খবরের কাগজে দেখতে পাই, শাওন আক্তার বাঁধন নামে একটি মেয়েকে টিএসসিতে শ্লীলতাহানি করা হয়েছিল। সেই ঘটনার পর ইংরেজি নতুন বছর উদযাপন করতে আমার আর টিএসসিতে যাওয়া হয়নি। শুধু আমি নই, হয়তো অনেকেই ইংরেজি নববর্ষের রাতে টিএসসিতে আর নিজেদের নিরাপদ মনে করেন না। সম্ভবত ২০০০ সালের পর থেকেই রাজধানী ঢাকার পুলিশ সিদ্ধান্ত নেয় মধ্যরাতে আর কাউকে ঘর থেকে বের হতে দেওয়া যাবে না। কালের বিবর্তনে ২০১৮ সালের ইংরেজি নতুন বছরকে বরণ করার প্রাক্কালে পুলিশ সবাইকে সন্ধ্যার পর ঘরে ফিরে যেতে বলেছে। মাথা ব্যথায় ধর থেকে মাথাকে নামিয়ে দেওয়ার মিশনে নেমেছে প্রশাসন।
আমার লেখার শুরুতে লন্ডনের বর্ষবরণের দৃষ্টান্ত টেনেছিলাম। কেমন করে ইংরেজরা বাংলা নতুন বছর ও চাইনিজ নিউ ইয়ার উৎসবে নিজেদের যুক্ত করে। তেমনি ইংরেজি নতুন বর্ষকে বরণ করতে আমরা কেন বাঁধনের মতো দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে পুরো জাতিকে উৎসব থেকে বঞ্চিত করবো। প্রশাসনই বা কেন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে সবাইকে ঘরে ফিরে যেতে বাধ্য করবে? পুলিশের কাজ জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ইংরেজি নববর্ষের উদযাপন করতে হয় রাত বারোটায় আর সেটি অবশ্যই খোলা ময়দানে, হয় আতশবাজি ফুটিয়ে নয়তো কনসার্ট করে। এটিই ইংরেজি সংস্কৃতি। সিডনি, লন্ডন, প্যারিসসহ বিশ্ববাসী একই প্রথায় স্বাগত জানায় ইংরেজি নববর্ষকে। অন্যদিকে ইংরেজি বর্ষবরণের বাংলাদেশি ভার্সনের উদ্ভাবন করতে গিয়ে আমরা নিজেদের পুরো বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করছি মাত্র। ইংরেজি নতুন বছরকে বরণ করে নিতে সরকারি/বেসরকারি বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে খোলা ময়দানে অনুষ্ঠান করা থেকে বঞ্চিত করা কোনোভাবেই উর্বর মস্তিষ্কের চিন্তা হতে পারে না।
ক্যান্সার রিসার্চ ইউকের একটি প্রকল্পে মিডিয়া পরামর্শক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদনে দেখেছিলাম ইন্ডিয়ান সাব কন্টিনেন্টে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম কারণ ধূমপান। ভারতীয় উপমহাদেশে তরুণদের একটা বড় অংশের ধূমপানে আসক্তি তৈরি হয় চলচ্চিত্রের নায়কের সিগারেট খাওয়া দেখে। অধিকাংশ তরুণরাই মনে করে, সিগারেট খাওয়া নায়কোচিত। তাই তারা সিগারেট খাওয়া শুরু করে। আমাদের দেশেও আশি-নব্বইয়ের দশকে চলচ্চিত্রের নায়কদের দেখা গেছে হতাশা থেকে রাস্তায় মদ খেয়ে মাতলামো করছে। অধিকাংশ চলচ্চিত্রে দেখানো হতো, ভিলেন নায়িকাকে বা কোনো অভিনেত্রীকে কিডন্যাপ করে এনে মদ পান করে ভায়োল্যান্স করছে। ডিসকো ক্লাবে নাচের উত্তেজনায় মদের বোতল ভাঙছেন। এসব দেখে তরুণদের মনে হতে পারে মদ খেয়ে বুঝি রাস্তায় মাতলামি করতে হয়। বিয়ার খেয়ে বিয়ারের বোতল রিকশায় বাড়ি ফেরা তরুণীর দিকে ছুড়ে মারতে হয়।
ব্রিটেনে তরুণদের এধরনের প্রবণতা থেকে ফেরাতে কাউন্সেলিং করা হয়। বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে কীভাবে সমাজে এন্টি সোশ্যাল বিহেভিয়ার সহনীয় মাত্রায় আনা যায়, তা নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র প্রচার করা হয়। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন তরুণদের ড্রাগ, অ্যালকোহল আসক্তি কমাতে কাজ করে। ১৯৯৯ সালে বাঁধনের শ্লীলতাহানির পরও টিএসসিকে নিরাপদ করা যায়নি।
দশ বছর মামলা বিলম্বিত করে আমরা বাঁধনের শ্লিলতাহানীর অভিযুক্তদের খালাস দিয়েছি। তার ফলাফল হিসেবে বইমেলা ও বাংলা বর্ষবরণ উৎসবে নারীর শ্লীলতাহানির ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে। এ প্রজন্মের তরুণরা কী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ দুর্নাম ঘুচাতে পেরেছে?
প্রশাসনকে যেমন যে কোনো উৎসবকে তার নিজস্ব ঢঙে চলতে দিতে হবে, তেমনি নাগরিক হিসেবে মেট্রোপলিটন সিটিতে বসবাস করে আমরা যদি কসমোপলিটন সিটির সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য উপভোগ করতে চাই তাহলে আমাদেরকে কসমোপলিস সৌজন্যতায়ও অভ্যস্ত হয়ে উঠতে হবে।

লেখক : কারেন্ট এফেয়ার্স এডিটর, চ্যানেল এস টেলিভিশন লন্ডন ও একাত্তর টেলিভিশনের যুক্তরাজ্য প্রতিনিধি।


সম্পাদক : জয়নাল হাজারী। ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯, ০১৭৫৬৯৩৮৩৩৮
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আইন উপদেষ্টা : এ্যাডভোকেট এম. সাইফুল আলম। আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি