মঙ্গলবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০১৮
জনপ্রশাসনে পদোন্নতি ও সুশাসন
ড. হারুন রশীদ
Published : Saturday, 6 January, 2018 at 5:34 PM

 জনপ্রশাসনে পদোন্নতি ও সুশাসনজনপ্রশাসনে পদোন্নতি একটি স্বাভাবিক ঘটনা। নির্দিষ্ট সময়ান্তে যোগ্যতা ও দক্ষতার মাপকাঠিতে কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়ার নিয়ম। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সব সময় যে নিয়ম রক্ষা করেই পদোন্নতি দেওয়া হয়—এমনটি হলফ করে বলা যায় না। অনেক সময় যোগ্যতা-দক্ষতার বাইরেও নানা বিবেচনা কাজ করে। সেসব বিবেচনাতেই পদোন্নতি দেওয়া হয়ে থাকে। তবে যাঁরা যোগ্য, দক্ষ ও অভিজ্ঞ তাঁদের বাদ দিয়ে অযোগ্য ও অদক্ষদের রাজনৈতিক বা অন্য কোনো বিবেচনায় পদোন্নতি দিলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে জনপ্রশাসনে। এ কারণে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে পদোন্নতি দেওয়া অনুচিত।
এ ছাড়া পদ না থাকলেও পদোন্নতি দেওয়া হলে তা নিয়েও প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এ ক্ষেত্রে পদোন্নতি পাওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে স্থায়ী পদ না থাকায় একই পদে কাজ করতে হয়। ধরা যাক, একজন উপসচিব যুগ্ম সচিব হিসেবে পদোন্নতি পেলেন। কিন্তু পদ না থাকায় তাঁকে উপসচিব হিসেবেই কাজ করতে হবে। অথচ ওই কর্মকর্তা বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাবেন যুগ্ম সচিবের; কিন্তু পদ না থাকায় তিনি সেবা দেবেন উপসচিবের। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র নিশ্চিতভাবেই বঞ্চিত হবে। অথচ জনগণের কষ্টার্জিত ট্যাক্সের টাকায় একজন কর্মকর্তার বেতন হয়।
সর্বশেষ যে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হলো, এটি নিয়েও কথা উঠেছে। জনপ্রশাসনে সম্প্রতি ১৯৩ জন কর্মকর্তাকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দিয়েছে সরকার। নিয়ম অনুযায়ী পদোন্নতি দিয়ে কর্মকর্তাদের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে। পদোন্নতিপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিবদের পদায়ন করা হয়নি।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পদোন্নতির পর যুগ্ম সচিবের মোট সংখ্যা হলো ৮৪২ জন। যুগ্ম সচিবের নিয়মিত পদের সংখ্যা ৪৫০-এর মতো। দেখা যাচ্ছে স্থায়ী পদের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। একটি আদর্শ প্রশাসনের ক্ষেত্রে ‘পিরামিড পদ্ধতি’ অনুসরণ করাই শ্রেয়। এতে ওপরের দিকে কর্মকর্তা কম থাকবে, নিচের দিকে অর্থাৎ মাঠপ্রশাসনে থাকবে বেশি; যাতে প্রশাসনে একটি ভারসাম্যমূলক অবস্থা সৃষ্টি হবে।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগও প্রশাসনে স্থবিরতা নিয়ে আসে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বহু ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মূল শর্ত হলো, দলীয় মনোভাব ও দলীয় আনুগত্য। এটা প্রশাসনের ভারসাম্য নষ্ট করে। অনেকের প্রমোশনের পথ বন্ধ হয়ে যায়, এটা কর্মকর্তাদের হতাশ করে।
বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরির বয়স ৫৯ বছর। আর মুক্তিযোদ্ধাদের অবসরের বয়স ৬০ বছর। বিশেষায়িত ও কারিগরি পদের ক্ষেত্রে যেখানে দক্ষ লোকের সংখ্যা খুবই কম, সেখানে শুধু চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, যাঁদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে তাঁরা কেউই ওই সব পদে অপরিহার্য নন। এ অবস্থার অবসান হওয়া জরুরি।
সরকার বিভিন্ন সময় বড় ধরনের পদোন্নতি দিলেও এখনো প্রশাসনে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা পদোন্নতিবঞ্চিত রয়েছেন। পদোন্নতির বঞ্চনা প্রশাসন ক্যাডার ছাড়া অন্যান্য ক্যাডারে বেশি। অনেক সময় দেখা যায় নিয়মমাফিক পদোন্নতি না হওয়ায় একই ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক বৈষম্য সৃষ্টি হয়। দক্ষতা-যোগ্যতা না থাকলেও কাউকে পদোন্নতি দিতে হবে—এমনটি নয়। তবে পদোন্নতির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, যাতে একজন যোগ্য কর্মকর্তা কোনো অবস্থাতেই বঞ্চিত না হন। কারণ যোগ্য কর্মকর্তা বঞ্চিত হলে শুধু তিনি নিজেই বঞ্চিত হবেন না, দেশও একজন দক্ষ প্রশাসকের সেবা থেকে বঞ্চিত হবে।
দুই. সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় তাঁর সরকারের প্রতিশ্রুতির কথা (জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে) বলতে গিয়ে দেশে সুশাসনের ঘাটতির জন্য তিনটি প্রধান কারণের কথা উল্লেখ করেন। এগুলো হচ্ছে জনপ্রশাসনে দক্ষতার অভাব, মাঝেমধ্যেই দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং অনিয়ম। প্রধানমন্ত্রীর এ কথার সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই। তবে এ কথা ঠিক যে সুশাসন ও প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ এবং এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত ও শক্তিশালী প্রয়াস প্রয়োজন। এ ছাড়া দেশে সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য প্রকৃত গণতন্ত্র এবং সুষম ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। এরই মধ্যে বর্তমান সরকার সুশাসন ও প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বহু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
জনপ্রশাসনের দক্ষতার ওপরই আসলে দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতি নির্ভর করে। আমাদের দেশে সচিবালয়কেন্দ্রিক যে এককেন্দ্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, তাতে উন্নয়ন-অগ্রগতির মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে তা। কাজেই এখানকার কাজের গতিশীলতা, দক্ষতা, অনিয়ম-দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশই আসলে দেশের উন্নতিকে ত্বরান্বিত করতে পারে। এ জন্য প্রশাসনকে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে। গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণের জন্য প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কার, জনপ্রশাসনে দক্ষতা বৃদ্ধি ও শক্তিশালী দুর্নীতি দমন কৌশল গ্রহণপূর্বক ২০১০-২০২১ প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ও পাঁচ বছর মেয়াদি ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তৎপর রয়েছে সরকার। এ ছাড়া সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করাটাও জরুরি। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। এ জন্য বিভিন্ন আইন প্রণয়ন, সংস্কার এবং তা যুগোপযোগী করা জরুরি।
জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। এ লক্ষ্যে সরকারকে নিরন্তর সচেষ্ট থাকতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দুর্নীতিমুক্ত রাখা অত্যন্ত জরুরি। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা কিংবা উন্নয়নের জন্যও সম্ভাব্য সব উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এভাবে মানুষের মধ্যে একটি নিরাপত্তাবোধ সৃষ্টি করতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না থাকলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে দেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা সম্ভব হয় না।
মানুষের আয় বাড়াতে হবে। এ জন্য বেকারত্ব হ্রাস ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই। সব ধরনের ধর্মীয় মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদ থেকে দেশকে মুক্ত রাখতে হবে। এ জন্য শিক্ষিত জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে হবে। কূপমণ্ডূকতা ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজব্যবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে। ক্ষুধা-দারিদ্র্য ও বৈষম্যমুক্ত সমাজব্যবস্থাই আসলে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে।
বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ২৪ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এভাবে বিদ্যুত্ব্যবস্থার আরো উন্নয়ন ঘটাতে হবে। দেশকে বিদ্যুৎ ও গ্যাসনির্ভর ভারী শিল্পের দিকে নিয়ে যেতে হবে। দেশের মানুষের প্রতি অঙ্গীকার ও সদিচ্ছা থাকলে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট


সম্পাদক : জয়নাল হাজারী। ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯, ০১৭৫৬৯৩৮৩৩৮
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আইন উপদেষ্টা : এ্যাডভোকেট এম. সাইফুল আলম। আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি