শুক্রবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০১৮
নতুন ক্রীড়ানীতি আলোর মুখ দেখবে কবে
ইকরামউজ্জমান
Published : Saturday, 13 January, 2018 at 6:52 PM

নতুন ক্রীড়ানীতি আলোর মুখ দেখবে কবেদিকভ্রান্তভাবে দেশের ক্রীড়াঙ্গন চলতে পারে না, চলার কথাও নয়। লক্ষ্যহীনভাবে চলা মানেই আসল উদ্দেশ্য শুধু বিঘ্নিত হওয়া নয়, সম্ভাবনাময় ক্রীড়াঙ্গনকে ধীরে ধীরে অকার্যকর করে ফেলা। ব্যক্তি ও সমষ্টির ইচ্ছা ও অনিচ্ছা, তাদের স্বার্থ চরিতার্থ করার কোনো সুযোগ নেই জাতীয় ক্রীড়াঙ্গনে। বাস্তবতায় এখন ক্রীড়াঙ্গন চলছে অনিশ্চয়তার মধ্যে, ‘ফ্রি স্টাইল’ কায়দায়! নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও দেশের স্বার্থ হরহামেশাই ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। নেই কোনো রকম জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতা। ক্রীড়াঙ্গনে চলছে নৈতিক সংকট। মৌলিক কার্যক্রম সব সময় ব্যাহত হচ্ছে।
সুযোগ, সময় ও বিভিন্ন ধরনের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে এমন সব কার্যকলাপ, আবেগ আর আবদারের খেলা চলে, যেটি স্বাধীন দেশে ক্রীড়াঙ্গনে চেতনার পরিপন্থী। ক্রীড়াঙ্গনে আদর্শগত শূন্যতা কখনো কাম্য হতে পারে না। ইতিহাসের চাকা পেছন দিকে ঘুরবে কেন? সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সুযোগ এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি। বর্তমান সরকার দেশের ক্রীড়াচর্চা, নতুন প্রতিভা বিকাশ ও সঠিকভাবে খেলাধুলার মানোন্নয়নের জন্য সব সময় বিভিন্নভাবে সাহায্য ও সহযোগিতা করছে। সরকারের তরফ থেকে এই সাপোর্ট ক্রীড়াঙ্গনে অনেক বড় শক্তি।
ক্রীড়াচর্চা এখন আর শুধু বিনোদনের একটি মাধ্যম নয়। দেশ ও জাতির জীবনে ক্রীড়াচর্চার প্রয়োজনীয়তা, মর্যাদা এবং এ ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্রীড়ানুরাগী মহলে কিন্তু ক্রমেই সচেতনতা বাড়ছে। মানুষ দেশকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে উজ্জ্বল অবস্থানে দেখতে চায়। খেলোয়াড় ও ক্রীড়াবিদদের মধ্যে দেখতে চায় জাতি-চরিত্রের প্রতিফলন, জাতীয়তাবোধ ও দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার সর্বাত্মক চেষ্টা। দুঃখজনক হলেও সত্য, ক্রীড়াঙ্গনের বাইরের মানুষের ভাষা ক্রীড়াঙ্গনসংশ্লিষ্ট সংগঠক মহল ও নীতিনির্ধারকরা বুঝতে পারছেন না।
ক্রীড়াঙ্গনে আস্থা ও স্থিতিশীলতার বড় অভাব। সাময়িক সাফল্য অর্জন নিয়ে আত্মতৃপ্তিতে ভোগার এখন আর অবকাশ নেই। আমাদের অনেক পেছনে থেকেও স্থিতিশীল পরিবেশে ধারাবাহিকতার সঙ্গে কাজ করে টপকে চলে গেছে অনেকেই অনেক দূরে। আমরা ১৯৯৮ সালের চিন্তাভাবনা এবং সেই সময়কার প্রেক্ষাপট থেকে এখনো বের হতে পারিনি! গত ৪৬ বছরে দেশ অর্থনীতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক সূচকে অনেক এগিয়েছে। ক্রীড়াঙ্গনেও সাফল্য আছে—তবে এ ক্ষেত্রে আরো অনেক বেশি অর্জন অসম্ভব ছিল না।
যে খেলাগুলোতে সম্ভাবনা ছিল, সেগুলোকে চিহ্নিত করে, এই খেলাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য যে আসল কাজগুলো করা দরকার ছিল, সেগুলো যদি করা হতো, তাহলে ক্রীড়াঙ্গনের চেহারা এখন অন্য রকম থাকত। মনে রাখতে হবে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সম্ভাবনার প্রেক্ষাপট পাল্টে যায়।
আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে যারা এগিয়ে চলেছে, প্রতিটি দেশেই ক্রীড়া কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বাস্তবতার আলোকে, সুষ্ঠু চিন্তাশীল ক্রীড়ানীতির মাধ্যমে লক্ষ্য নির্ধারণ, শৃঙ্খলা, অঙ্গীকার, গণতন্ত্রচর্চা, সুশাসন ও ক্রীড়া সংস্কৃতিকে সমুন্নত রেখে। গণতন্ত্র, সুশাসন ও ক্রীড়া উন্নয়ন—এর সবই দরকার। এই তিনের মধ্যে সমন্বয় করে ক্রীড়াঙ্গনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব ক্রীড়া সংগঠকদের। সংগঠকদের বিচার-বিবেচনার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে দেশে একটি ক্রীড়ানীতি আছে। এটি অনেক পুরনো। ক্রীড়ানীতি প্রণয়ন করে জাদুঘরে রাখার মতো জিনিস এটি নয়। এটি সময় ও দেশের ক্রীড়াচর্চার প্রয়োজনে পরিবর্তনশীল, পরিবর্ধন, সংশোধন, নতুন সংযোজনের বিষয়। সময় ও পরিস্থিতির সঙ্গে এটিকে ‘আপডেট’ রাখতে হবে। ক্রীড়ানীতি তো দেশের ক্রীড়াঙ্গনের ‘গাইডলাইন’। এটিকে পাঁচ বছরের বেশি টেনে নেওয়া উচিত নয়। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর ক্রীড়ানীতির পর্যালোচনা, সময়োপযোগী পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও সংযোজনের ব্যবস্থার দায়দায়িত্ব যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের। অথচ প্রায় ২০ বছর ধরে ক্রীড়ানীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি উপেক্ষিত।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের ১৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নাগরিকদের বিশ্রাম, বিনোদন ও অবকাশের অধিকার অর্জন নিশ্চিত করতে জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত উন্নতি সাধন প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হয়েছে। ১৮ বছর পর ১৯৮৯ সালে প্রথম জাতীয় ক্রীড়ানীতি প্রণয়নের উদ্দেশ্যে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তখনকার সচিবের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি কর্তৃক প্রণীত খসড়া জাতীয় ক্রীড়ানীতি যথাযথ অনুমোদনের পর ১৯৮৯ সালের ১২ জুলাই জারি করা হয়। এরপর আবার যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয় ক্রীড়াক্ষেত্রে পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন করে সংশোধন-সংযোজনের জন্য। এই কমিটি ক্রীড়ানীতি ১৯৮৯কে ভিত্তি হিসেবে ধরে জাতীয় ক্রীড়া সম্মেলন ১৯৯৫ ও ১৯৯৬ সালের সুপারিশমালার আলোকে জাতীয় ক্রীড়ানীতির খসড়া প্রণয়ন করে। এই জাতীয় ক্রীড়ানীতি ১৯৯৮ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে অনুমোদিত হয়। এরপর ২০০৭ সালে জাতীয় ক্রীড়ানীতি যুগোপযোগী করে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করে একটি কমিটি গঠিত হয়। দীর্ঘ কয়েক বছর অতিবাহিত করে এই কমিটি কোনো ফলপ্রসূ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। সমস্যাটি হলো সময় দিয়ে কাজটি করার ক্ষেত্রে উৎসাহে ভাটা ছিল। তা ছাড়া ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ বিষয়টিকে তেমন আমল দেয়নি। ভাবা হয়েছে ক্রীড়াঙ্গন তো আটকে নেই। ক্রীড়াঙ্গনে খেলার চর্চার পাশাপাশি সময় গুরুত্বপূর্ণ। খেলার সার্বিক অবস্থা, অগ্রগতি, সাফল্য, ট্রেন্ড সম্ভাবনা বুঝেই তো বিশেষজ্ঞরা অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করেন। তবে এটি কখনো স্থায়ী, তা কিন্তু নয়।
এরপর ২০১৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় জাতীয় ক্রীড়ানীতি প্রণয়নের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালের ৩ ডিসেম্বর। এই সভায় ১৮ সদস্যের জাতীয় ক্রীড়ানীতি প্রণয়ন কমিটি গঠন করা হয়। এরপর এই কমিটির দ্বিতীয় ও তৃতীয় সভা যথাক্রমে অনুষ্ঠিত হয় ২৩ এপ্রিল ২০১৫ ও ২৯ ডিসেম্বর ২০১৬ সালে। ২৯ জানুয়ারি ২০১৭ সালে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ থেকে জাতীয় ক্রীড়ানীতির খসড়া যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় বিভিন্ন পর্যায় থেকে আরো কিছু সুপারিশ পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আবার একটি সাবকমিটি তৈরি করে দিয়েছে বিষয়গুলো পর্যালোচনা এবং দেখার জন্য। এদিকে কিন্তু ২০ বছর পার হয়ে গেছে। ২০১৮ সাল শুরু হয়েছে। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, নতুন করে ক্রীড়ানীতি তৈরি করতে আর কত সময় লাগবে? বিষয়টি ক্রীড়াচর্চাকে ভোগাচ্ছে, প্রত্যক্ষভাবে বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি করছে। দেশে ৪৯টি ক্রীড়া ফেডারেশন, বোর্ড ও অ্যাসোসিয়েশন আছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে শুধু খেলাধুলার জন্য ১২০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। ক্রীড়া কর্মকাণ্ডে এই বরাদ্দ খুবই অপ্রতুল। খেলাধুলা পরিচালনার জন্য প্রয়োজন অর্থের। যুগোপযোগী ক্রীড়ানীতি না থাকায় অগ্রাধিকার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে না। ক্রীড়াঙ্গনে এখন সোনা ও পিতলের অবস্থান একই রকম। অনেক ক্ষেত্রে পিতলের প্রাধান্য সোনার চেয়েও বেশি লক্ষ করা যায়।
সময় এসেছে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেসব খেলায় সম্ভাবনা আছে, সেগুলোর দিকে নজর দেওয়া। সবাই বিদেশে অংশ নিতে যেতে চায়। এর জন্য সব সময় হৈচৈ! কিন্তু ভাবা হয় না গিয়ে কী হবে? এখন তো অংশগ্রহণের জন্য অংশগ্রহণের দিন ফুরিয়ে গেছে। ২০ জনের মধ্যে ২০ নম্বর হলে তো করুণার পাত্র হতে হয়। এটি তো ক্রীড়া ফেডারেশন ও দেশের জন্য লজ্জার বিষয়। জনগণের দেওয়া করের লাখ লাখ টাকা খরচ করে বড় ‘কন্টিনজেন্ট’ বিদেশে পাঠিয়ে দেশের জন্য লজ্জা বহন করে আনার তো জবাবদিহি আছে। ক্রীড়ানীতিতে এ ধরনের সমস্যার আশু সমাধান বড় জরুরি।
লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক



সম্পাদক : জয়নাল হাজারী। ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯, ০১৭৫৬৯৩৮৩৩৮
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আইন উপদেষ্টা : এ্যাডভোকেট এম. সাইফুল আলম। আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি