বুধবার, ১৭ জুলাই, ২০১৯
কাজির গরু গোয়ালে নেই, দোষটা কার?
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
Published : Sunday, 30 June, 2019 at 8:30 PM

কাজির গরু গোয়ালে নেই, দোষটা কার?এক অনুজপ্রতিম কলামিস্ট ঢাকার একটি কাগজে দেশে নির্যাতন বন্ধে সরকারের সদিচ্ছার অভাব সম্পর্কে একটি কলাম লিখেছেন এবং মন্তব্য করেছেন, ড. কামাল হোসেনের মতো আইনজীবীও তার মতে সায় দিয়ে বলেছেন, আফ্রিকায় অনেক দেশেও ভালো ভালো চুক্তি ও আইন আছে, কিন্তু তার বাস্তবায়ন নেই। কলামিস্টের অভিযোগ, বাংলাদেশে ভয়াবহ নির্যাতনের খবর কাগজে প্রকাশিত হয় না, এমন একটি দিন পাওয়া যায় না। কিন্তু সেজন্যে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কারো শাস্তি হয়েছে, এমন খবর তার জানা নেই।
লেখাটি আমি একটু আগ্রহ নিয়ে পড়েছি। ধারণা করেছিলাম, বাংলাদেশে প্রত্যহ যে নানা ধরনের ভয়াবহ নির্যাতন চলে, যার কোনোটি গোপন এবং কোনোটি প্রকাশ্য, তা দমনে সরকার কেন নিষ্ক্রিয় অথবা সমাজে কোনো সচেতনতা গড়ে উঠছে না—সে সম্পর্কে এই তরুণ বুদ্ধিজীবীর কাছ থেকে একটি মননধর্মী ভালো বিশ্লেষণ পাব। কিন্তু নিবন্ধটি পাঠ করে বুঝলাম, এটা হাসিনা সরকারকে সকল ব্যাপারে দায়ী করার একটি সূক্ষ্ম প্রচারণা। এই প্রচারণাটি চালাবার জন্য একটি ‘নিরপেক্ষ’ দৈনিক বিশেষভাবে কিছু ‘নিরপেক্ষ’ কলামিস্ট তৈরি করেছেন ও পোষণ করছেন, ইনিও তাদের একজন।
তিনি নির্যাতন বলতে মূলত রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নির্যাতনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু নির্যাতন এক ধরনের নয়। সমাজবিজ্ঞানে নির্যাতন বহু ধরনের। রাজনৈতিক নির্যাতন, সামাজিক নির্যাতন, পারিবারিক নির্যাতন, ব্যক্তিগত নির্যাতন, সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় বৈষম্য ও নির্যাতন। অধিকাংশ সভ্য দেশেই এই নির্যাতন-বিরোধী আইন আছে। কিন্তু বাস্তবায়ন কম। যেসব দেশে এই বাস্তবায়ন বেশি, সেসব দেশে সুশাসন তত বেশি প্রতিষ্ঠিত বলে ধরা হয়। বাংলাদেশে সরকার এই সুশাসনটি এখনো আশানুরূপভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি, এ কথা সত্য। এজন্য রাষ্ট্রব্যবস্থায় যেমন বড়ো ধরনের ত্রুটি রয়েছে, তেমনি সমাজব্যবস্থায় রয়েছে সচেতনতা ও দায়িত্ববোধের অভাব। এই সচেতনতা ও দায়িত্ববোধের মধ্যে মিলন না হলে উন্নত ও উন্নয়নশীল নির্বিশেষে যে-কোনো দেশেই নির্যাতনবিরোধী আইন করা সম্ভব, তার বাস্তবায়ন অসম্ভব। ব্রিটেনের মতো উন্নত দেশে বর্ণবৈষম্য ও নারী নির্যাতন-বিরোধী কঠোর আইন রয়েছে। কিন্তু দেশের সরকারের আগ্রহ থাকলেও এই আইনের পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে কি? হয়নি। এজন্যেই বলা হয়, কেবল আইন করে সমাজ সংস্কার করা যায় না। অবরোধ দমন করা যায় না। এজন্যে দরকার হবে সমাজে সচেতনতা এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধ। নির্যাতন হলো অপরাধ। এ সম্পর্কে জনসমাজ অসচেতন থাকলে রাষ্ট্রও তা দমনে বা উচ্ছেদে অনিচ্ছুক থাকে, কারণ, সমাজের মানুষগুলোই রাষ্ট্রেরও পরিচালক।
ভারতে নারী ধর্ষণের জন্য অপরাধীকে ফাঁসি দেওয়ার আইন করা হয়েছে। তারপরও নারী ধর্ষণ বেড়েই চলেছে। তার কারণ, সমাজে নারী ধর্ষণ অপরাধ হিসেবে তেমন গুরুত্ব এখনো পায়নি। এই সামাজিক মনোভাবেরই প্রতিফলন ঘটে সরকারের ও বিচার ব্যবস্থার মনোভাবে। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে। বাংলাদেশে নুসরাত-ধর্ষণ ও আগুনে পুড়িয়ে মারায় গোটা জনসমাজ যদি প্রতিবাদ-মুখর হয়ে না উঠত, তাহলে রাষ্ট্রও অপরাধীদের দ্রুত শাস্তিদানে এত তত্পরতা দেখাত না। দেশে প্রতিদিনই তো কত নুসরাত বর্বরতার শিকার হয়, অপরাধীদের কোনো বিচার ও শাস্তি হয় কি?
অপরাধীরা সমাজ-কর্তা হলে তো কথাই নেই। আইন তাদের পশম স্পর্শও করতে পারে না। সুতরাং আইন করলেই চলবে না। কেবল নুসরাত হত্যার মতো একটি ঘটনায় নয়, নারী ধর্ষণের সকল ঘটনায় সমাজের বিবেক জাগ্রত হলে রাষ্ট্রও তখন বাধ্য হবে এই ব্যাপারে আইনকে শক্তভাবে কার্যকরি করতে সক্রিয় হতে। শুধু নারী নির্যাতন নয়, সকল নির্যাতনের বিরুদ্ধে সমাজ মানসে সচেতনতা ও তার প্রতিরোধে দায়িত্ববোধ তৈরি করা দরকার। জনসমাজ শিক্ষিত ও নিজেদের অধিকার ও দায়িত্ববোধ সম্পর্কে সচেতন ও সক্রিয় থাকলে রাষ্ট্র ব্যবস্থাও তাদের দায়িত্ব পালনে নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে না। কারণ, জনসমর্থন তাদের দরকার। ব্রিটেনে এখন নাইফ ক্রাইম মহামারির মতো দেখা দিয়েছে। রোজ ছুরিকাহত হয়ে লন্ডনের রাস্তাঘাটে মানুষ মরছে। বিশেষ করে টিনএজারদের মধ্যেই এই ক্রাইম বেশি। আইন করেও কিছু করা যাচ্ছে না। এই অবস্থা বাংলাদেশে ঘটলে আমাদের ‘নিরপেক্ষ’ কলামিস্ট ও বুদ্ধিজীবীরা চিত্কার শুরু করতেন, ‘বাংলাদেশে হাসিনা সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থ। এখনই এই সরকারের পদত্যাগ চাই।’ কিন্তু এই স্লোগান ব্রিটেনে ওঠেনি। ব্রিটেনে সাংবাদিক, রাজনীতিক ও সমাজ বিজ্ঞানী সকলেই সম্মিলিত চেষ্টা চালাচ্ছেন। আবিষ্কার করতে এই নাইফ ক্রাইমের উত্স কী, কারণ কী? কারণ জানা গেলে তখন এটাকে সামাজিক ব্যাধি হিসেবে তার চিকিত্সার ব্যবস্থা করা হবে। এই নাইফ ক্রাইম দেখা দেওয়ার জন্য কেবল সরকারের ওপর সব দায়িত্ব না চাপিয়ে এই ব্যাপারে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের করণীয় কী তা নিয়ে সংবাদপত্রে লেখালেখি হচ্ছে।
বাংলাদেশের তরুণ কলামিস্ট তাঁর আলোচনায় রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নির্যাতনের ওপরই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। এই নির্যাতন বন্ধে যেসব আইন আছে, তা প্রয়োগে সরকার আগ্রহ দেখাচ্ছেন না এবং এ সম্পর্কে আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোও আমল দিচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন। কিন্তু তার আসল কারণগুলো বিশ্লেষণ করেননি। তার কারণ কলামিস্টের টার্গেট বর্তমান সরকার। সমস্যার বাস্তবতা তুলে ধরা নয়।
বাংলাদেশে পরিস্থিতির বাস্তবতা হলো জনসমাজের ওপরের স্তরে আধুনিক নগর জীবনের চাকচিক্য বাড়লেও তার মানসিকতা এখনো আধা সামন্তবাদী। রাষ্ট্রও তার অতীতের কলোনিয়াল চরিত্র থেকে মুক্ত হতে পারেনি। অতীতের সামরিক ও স্বৈরাচারী শাসন সমাজের ও রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্রকে আরো পোক্ত করেছে। হাসিনা সরকার প্রাণপণে দেশের গণতান্ত্রিক চরিত্র ধরে রাখতে পেরেছেন। কিন্তু সমাজ সংস্কার দ্বারা সমাজ মানসে রেডিক্যাল কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারেননি। নিজেরাও সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হতে পারেননি।
সামন্তবাদের এবং কলোনিয়াল যুগের প্রভাব ও সংস্কার থেকে জনসমাজকে মুক্ত করা একা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। সেজন্যে সমাজের শিক্ষিত এবং সুশীল সমাজের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। ব্রিটিশ আমলে হিন্দু সমাজে সতীদাহের মতো বর্বর নারী-হত্যা বন্ধ এবং বিধবা বিবাহ প্রচলনের জন্য সরকার আইন করে কিছু করতে পারেননি। এজন্যে বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়ের মতো তত্কালীন সুশীল সমাজের শীর্ষ নেতারা এগিয়ে এসেছেন এবং নানারকম নির্যাতন বরণ করেছেন। বাংলাদেশের বর্তমান সুশীল সমাজের শীর্ষ নেতারা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নির্যাতন, নারী নির্যাতন, সাম্প্রদায়িক নির্যাতন, ধর্মীয় নির্যাতন ইত্যাদি সর্বপ্রকার সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নির্যাতন সম্পর্কে জনসমাজের কুসংস্কার ও উদাসীনতা দূর এবং জনসমাজে সচেতনতা ও প্রতিরোধ তৈরিতে এগিয়ে আসতে রাজি আছেন কি? নাকি দেশের সবচাইতে বেশি সুবিধাভোগী শ্রেণি হিসেবে এই সুযোগ-সুবিধার গজদন্ত মিনারে বসে তাদের পছন্দের নয়, এমন সরকারের কাঁধে সকল দায়দায়িত্ব চাপিয়ে রোম সম্রাট নিরোর মতো বাঁশি বাজাতে থাকবেন? রাষ্ট্র নিজে নির্যাতন করে না। করে রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রযন্ত্র দখল করার পর নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে। এই ব্যাপারে তরুণ কলামিস্ট যে রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীকে কখনো পরোক্ষ, কখনো প্রত্যক্ষভাবে সমর্থন করেন, ক্ষমতায় থাকাকালে ভয়ংকর গণনির্যাতনে তাদের ভূমিকা কী ছিল? কারোই ওপরের দিকে থুতু ছুড়ে মারা উচিত নয়। তা নিজের মুখেই পড়ে।


সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি