শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
বাংলাদেশে মিসর ও তুরস্কের পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে কি?
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
Published : Monday, 8 July, 2019 at 9:31 PM

বাংলাদেশে মিসর ও তুরস্কের পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে কি?গত সপ্তাহে এই প্রবন্ধের প্রথম কিস্তিতে লিখেছিলাম, আমাকে যে পত্র-লেখক বন্ধু তার চিঠিতে বাংলাদেশে মিসর ও তুরস্কের পরিস্থিতি দেখা দিতে পারার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, আমি তার সঙ্গে এই ব্যাপারে সহমত পোষণ করি না। কিন্তু আমার এই বিশ্বাসের ভিত্তি খুব শক্ত নয়। মিসর ও তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো ভিন্ন। এটাই ভরসা। গত সপ্তাহে এই প্রবন্ধের প্রথম কিস্তিতে লিখেছিলাম, আমাকে যে পত্র-লেখক বন্ধু তার চিঠিতে বাংলাদেশে মিসর ও তুরস্কের পরিস্থিতি দেখা দিতে পারার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, আমি তার সঙ্গে এই ব্যাপারে সহমত পোষণ করি না। কিন্তু আমার এই বিশ্বাসের ভিত্তি খুব শক্ত নয়। মিসর ও তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো ভিন্ন। এটাই ভরসা।
বাংলাদেশের ইসলাম কট্টরপন্থী নয়। ইসলাম প্রচারিত হয়েছে সুফি দরবেশ ধর্মপ্রচারকদের দ্বারা এবং আউল-বাউল, সহজিয়া, মরমিয়া উপধর্মগুলোর সংমিশ্রণে উগ্রতা ও সংকীর্ণতাকে পরিহার করতে পেরেছে। বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রিয়। কিন্তু ধর্মান্ধ নয়।
তাই ওয়াহাবি তত্ত্ব বা কট্টর ইসলাম সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে এসে শক্ত শিকড় গাড়তে পারেনি। জামায়াত পাকিস্তানি আমল থেকে এত শক্তি সঞ্চয় করা সত্ত্বেও সেই আমলে, এমনকি বাংলাদেশেও নির্বাচনে ক্ষমতা দখলের মতো আসন দখল কখনও করতে পারেনি, এটা তার প্রমাণ। তুরস্কে ও মিসরে উগ্র মৌলবাদীরা তা পেরেছে।
বাংলাদেশে তাই বাঙালির নিজ ধর্মনিরপেক্ষ ভাষা, সাহিত্য, সভ্যতা-সংস্কৃতির ভিত্তিতেই বাঙালি জাতীয়তাবাদ শেখ মুজিবের নেতৃত্বে শক্তিশালী হয়েছে এবং স্বাধীনতার মূল আদর্শ হতে পেরেছে। এই আদর্শের বিরোধিতা- এমনকি ওয়াহাবিপন্থীরাও এই আদর্শের সরাসরি বিরোধিতা করতে পারেনি।
তাদের ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাকে বাংলাদেশি জাতীয়তা নামে অসাম্প্রদায়িকতার খোলস পরাতে হয়েছে।
মিসরে ও তুরস্কে ধর্মভিত্তিক উগ্র রাজনৈতিক দলগুলো, যেমন মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুড নিজ নামেই রাজনীতি করেছে, অসাম্প্রদায়িক নামের রাজনৈতিক দলের নামের আশ্রয়ে রাজনীতি করেনি। বাংলাদেশে জামায়াত এককভাবে বা জোটবদ্ধ হয়েও কোনো নির্বাচনে জয়ী হয়নি।
মিসরে মোহাম্মদ মুরসির নেতৃত্বে মৌলবাদীরা বিশাল নির্বাচন জয়ের অধিকারী হয়ে ক্ষমতায় গিয়েছিলেন। তুরস্কের এরদোগানের দল উগ্র ধর্মবাদী না হলেও ইসলামপন্থী দল। তারাও বিশাল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। মিসরে ধর্মনিরপেক্ষ নাসেরবাদ এবং তুরস্কের অনুরূপ কামালবাদ দুই-ই আজ বিপর্যস্ত। সামরিক বাহিনী অভ্যুত্থান ঘটিয়েও তুরস্কে এরদোগানের পতন ঘটাতে পারেনি।
বাংলাদেশের চিত্রটা একটু ভিন্ন। এই দেশের সমতল মাটি, সহজিয়া সমাজ কাঠামোতে সহজিয়া সুফিবাদ যত শক্তিশালী, কট্টর ওয়াহাবিপন্থী প্রবল প্রভাব বিস্তার করেও ততটা স্থায়ী শক্তির অধিকাধী হতে পারেনি। জামায়াতিরা কট্টর ওয়াহাবিপন্থী।
মিসর, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, সুদান, মরক্কো, তিউনিসিয়াতেও তাই। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই কট্টরপন্থা প্রশ্রয় পায়নি।
জামায়াতপন্থীরা পাকিস্তান আমলেও নির্বাচনে একটি আসনও পায়নি। বাংলাদেশে বিএনপিকে আশ্রয় করে রাজনৈতিক অস্তিত্ব বজায় রাখতে হয়েছে এবং সাধারণ নির্বাচনে অতি অল্পসংখ্যক আসন পেয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। গণতান্ত্রিক পন্থায় তুরস্ক ও মিসরের মতো বাংলাদেশে ক্ষমতা দখল সম্ভব নয় জেনেই জামায়াত ও তার সহযোগী উপদলগুলো ’৭১ সালে গণহত্যায় অংশ নিয়ে এবং বাংলাদেশে বিএনপির ছাতার তলে আশ্রয় নিয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসের রাজনীতি দ্বারা ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করেছে। তারা ব্যর্থ হয়েছে। ‘বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি, জেনে নিক দুর্বৃত্ত’- শুধু জামায়াত নয়, তাদের সহোদর বিএনপিও তা এতদিনে জেনেছে।
আমি তাই অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশে তুরস্ক ও মিসরের পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে এ আশঙ্কা করি না। কিন্তু একটা আশঙ্কা করি, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ও সেক্যুলারপন্থী রাজনীতি ক্রমশ দুর্বল ও ঐক্যহীন হয়ে পড়ায় এবং নেতৃত্বে শূন্যতা সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দেয়ায় রাজনীতিতে এই শূন্যতা পূরণে যদি উগ্র মৌলবাদ আধুনিকতার ছদ্মবেশ ধারণ করে (তুরস্কের মতো) এগিয়ে আসে, তাহলে তা প্রতিরোধ করবে কে? বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ধর্মীয় জাতীয়তা জনগণ আর গ্রহণ করবে না এটা বুঝতে পেরে বিএনপিসহ সাম্প্রদায়িক দলগুলো ‘বাংলাদেশি জাতীয়তার’ অসাম্প্রদায়িক খোলস ধারণ করেছিল। সেকথা আগেই লিখেছি। জামায়াত ও তার সহযোগী উগ্র মৌলবাদী দলগুলো ধর্মীয় লেবাস ও আচার-আচরণ ত্যাগ করে তাদের ক্যাডারদের সম্পূর্ণ আধুনিক ট্রেন্ডি সাজে সাজিয়েছে।
আগের লম্বা দাড়ির বদলে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, পরনে হালফ্যাশনের স্যুট, টাই অথবা শার্ট ও শর্ট, হাতে ক্রিকেটের ব্যাট এটা হচ্ছে জামায়াতের আধুনিক ক্যাডাদের অধিকাংশের চেহারা। তারা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত এবং সহজেই আত্মপরিচয় লুকিয়ে জনসমাজে মিশে যেতে পারে।
বিএনপির আমলে রাষ্ট্র ক্ষমতার অংশীদার হয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সিভিল ও মিলিটারি প্রশাসনের এমন কোনো অংশ নেই যেখানে তাদের শক্তিশালী অবস্থান নেই। বিএনপিকে গ্রাস করার পর তারা আওয়ামী লীগেও বিপুলভাবে অনুপ্রবেশ শুরু করেছে। এখন তারা ঘাপটি মেরে আছে। আছে সুযোগের অপেক্ষায়। তাহলে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদের রক্ষাকবচটি কোথায়? গণসংগঠন হিসেবে ভারতের কংগ্রেসের মতো বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ চরিত্র হারিয়েছে। অনেক ভালো নেতা ও কর্মী দলটিতে আছেন। কিন্তু নব্য আওয়ামী লীগারদের দাপটে তারা কোণঠাসা। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি জামায়াতের উদরস্থ। একটি সুশীল সমাজ, ত্রিশের ইউরোপের সুশীল সমাজের বৃহৎ অংশের মতো নাৎসিদের ভজনা এবং নিজেদের স্বার্থ ও সুবিধা রক্ষায় ব্যস্ত। কিছু ফসিল রাজনৈতিক নেতা হাসিনা-ফোবিয়ায় ভোগেন। দেশ ও জাতির ভবিষ্যতের কথা না ভেবে নিজেদের রাগ, বিদ্বেষ ও প্রতিশোধস্পৃহা থেকে রাজনীতির পানি ঘোলা করছেন।
এই অবস্থায় শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ক্যারিশমা, শক্তিশালী নেতৃত্বই গণতান্ত্রিক বাংলার একমাত্র রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি নিজেই এখন একটি সংগঠন। কিন্তু তার নিজের সংগঠন এখন আগের চরিত্র, শক্তি ও গণসম্পৃক্ততা ক্রমশ হারিয়ে ভারতের কংগ্রেসের অবস্থায় পৌঁছতে চলেছে। সংগঠন দুর্বল হলে যা হয়, সরকার আমলাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের বেলাতেও তাই ঘটেছে। আশঙ্কার আরও একটি দিক হল, বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র ব্রিটিশ আমল, এমনকি পাকিস্তানি আমলের মতোও দক্ষ ও যোগ্য নয়। তবু বাংলাদেশে আমলাতন্ত্র যে এখন ক্ষমতায় সর্বেসর্বা, তার কারণ, তাদের মাথার উপর বসে থাকা রাজনীতিকদের অধিকাংশই আরও বেশি দুর্বল ও অযোগ্য। হাসিনা যদি রাজনীতি থেকে অবসর নেন, তাহলে আওয়ামী লীগের অস্তিত্বই বিপন্ন হবে। কারণ, আওয়ামী লীগে নতুন নেতৃত্ব তৈরির পথ বহুদিন আগেই বন্ধ হয়ে গেছে।
শেখ হাসিনার বিকল্প কোনো নেতৃত্ব দেশে নেই। আওয়ামী লীগের বিকল্প কোনো গণতান্ত্রিক, স্বাধীনতা যুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী কোনো বিকল্প গণতান্ত্রিক দল গড়ে উঠছে না অথবা গড়ে উঠতে দেয়া হচ্ছে না। এটা দেশের ভবিষ্যতের জন্য একটা বিপজ্জনক অবস্থার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এ সম্পর্কে দেশের গণতান্ত্রিক ও সেক্যুলারিস্ট নেতারা এবং সুশীল সমাজ যদি সময় থাকতে সচেতন ও সক্রিয় না হন, তাহলে বাংলাদেশে মিসর ও তুরস্কের পরিস্থিতির উদ্ভব না হোক, তার কাছাকাছি অবস্থার উদ্ভব হতে পারে। আমার বিশ্বাস তা হবে না। কিন্তু বিশ্বাস দিয়ে সবসময় বাস্তবতাকে রোখা যায় না। (সমাপ্ত)


সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি