শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
রোহিঙ্গা গ্রাম গুঁড়িয়ে সরকারি স্থাপনা
Published : Wednesday, 11 September, 2019 at 8:06 PM

রোহিঙ্গা গ্রাম গুঁড়িয়ে সরকারি স্থাপনাআন্তর্জাতিক ডেস্ক,
মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের পুরো গ্রাম গুড়িয়ে দিয়ে তৈরি করা হয়েছে পুলিশের ব্যারাক, সরকারি ভবন এবং শরণার্থী পুনর্বাসন শিবির। বিবিসির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
মিয়ানমার সরকারের আয়োজিত এক সফরে গিয়ে বিবিসি অন্তত চারটি স্থান খুঁজে পেয়েছে যেখানে সুরক্ষিত স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। অথচ স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে এগুলো আগে ছিল রোহিঙ্গা মুসলিমদের বসতি। তবে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা গ্রামে এসব স্থাপনা তৈরির অভিযোগ নাকচ করেছেন সরকারি কর্মকর্তারা।
২০১৭ সালে সামরিক অভিযানের জেরে সাত লাখের রোহিঙ্গা মিয়ানমার ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। জাতিসংঘ একে জাতিগত নির্মূল কর্মকাণ্ডের ‘টেক্সটবুক’ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে নিজেদের বাহিনীর হাতে বড় মাত্রায় হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ নাকচ করেছে মিয়ানমার।
মিয়ানমার, মূলত বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি দেশ, সেনাবাহিনীর হাতে জাতিগত দমন এবং গণহত্যার অভিযোগ ধারাবাহিকভাবে অস্বীকার করে আসছে। তবে এখন তারা বলছে যে, তারা কিছু পরিমাণ শরণার্থী ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত। কিন্তু গত মাসে, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের দ্বিতীয় চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে। মিয়ানমারের অনুমোদিত ৩ হাজার ৪৫০ জন রোহিঙ্গার মধ্যে কেউই ফিরতে না চাইলে এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
তারা অভিযোগ তোলে যে, ২০১৭ সালে সংঘটিত নিপীড়নের জন্য কোন জবাবদিহিতা নেই এবং নিজেদের চলাফেরায় স্বাধীনতা ও নাগরিকত্ব পাওয়া নিয়েও কোন নিশ্চয়তা নেই।
এই ব্যর্থতার জন্য বাংলাদেশকে দায়ী করেছে মিয়ানমার। তারা বলছে, তারা অনেক রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত ছিল। এই বিষয়টি প্রমাণ করতেই বিবিসিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের তাদের প্রস্তুতি পরিদর্শনের জন্য আমন্ত্রণ জানায়। সাধারণত রাখাইনে প্রবেশের ক্ষেত্রে বিস্তর কড়াকড়ি রয়েছে। আমরা সরকারি গাড়ি বহরে ভ্রমণ করি এবং পুলিশের তত্ত্বাবধান ব্যতীত ছবি তোলা ও সাক্ষাৎকার নেয়ার অনুমতি আমাদের ছিল না। তবে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে উচ্ছেদের অকাট্য প্রমাণ দেখতে পাই আমরা।
স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউট জানায়, ২০১৭ সালে ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গা গ্রামগুলোর মধ্যে কমপক্ষে ৪০ ভাগ গ্রাম পুরোপুরি গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
মিয়ানমারে কী দেখেছে বিবিসি?
মিয়ানমারের সরকার আমাদের হ্লা পো কং নামে একটি ট্রানজিট ক্যাম্পে নিয়ে যায়। তারা দাবি করে যে, স্থায়ী আবাসে ফেরার আগে এই শিবিরটিতে ২৫ হাজার শরণার্থী দুই মাস ধরে থাকতে পারবে।
এই শিবিরটি এক বছর আগে তৈরি করা হয়েছিল। তবে এখন এর অবস্থা করুণ। এরইমধ্যে এর টয়লেটগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। ২০১৭ সালের সহিংসতায় ধ্বংস হওয় দুটি গ্রাম ‘হ রি তু লার’ এবং ‘থার হায় কোন’ নামে রোহিঙ্গা গ্রামের ওপর এই শিবিরটি তৈরি করা হয়েছে। আমি যখন শিবিরটির পরিচালক সো শোয়ে অংকে জিজ্ঞাসা করলাম যে গ্রাম দুটো গুড়িয়ে দেয়া হল কেন, তখন তিনি কোনো গ্রাম গুড়িয়ে দেয়ার কথা অস্বীকার করলেন।
কিন্তু যখন আমি দেখালাম যে স্যাটেলাইট চিত্রে এর প্রমাণ রয়েছে, তখন তিনি বললেন যে, তিনি কয়েক দিন আগে দাযড়ত্ব গ্রহণ করেছেন এবং এ বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারবেন না।
এরপর কিয়েন চং নামে আরেকটি পুনর্বাসন শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয় আমাদের। সেখানে জাপান এবং ভারত সরকারের সহায়তায় বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য।
তবে এই পুনর্বাসন শিবিরটি তৈরির জন্য মিয়ার জিন নামে একটি রোহিঙ্গা গ্রাম বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। এই গ্রামটি ছিল নতুন করে মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষা পুলিশ বাহিনীর জন্য বানানো একটি ব্যারাকের পাশে।
২০১৭ সালে নিরাপত্তা বাহিনীর এই অংশটির বিরুদ্ধে ব্যাপক নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছিল রোহিঙ্গারা। ক্যামেরার পেছনে মিয়ার জিন গ্রামটি গুড়িয়ে দেয়ার কথা স্বীকার করেন কর্মকর্তারা। মংডু শহরের বাইরেই অবস্থিত মিও থু গাই নামে একটি গ্রামে একসময় ৮ হাজার রোহিঙ্গার বাস ছিল।
২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে, আরেকটি সরকারি গাড়ি বহরে করে ভ্রমণের সময় ওই গ্রামটির ছবি তুলেছিলাম আমি। ওই গ্রামের অনেক বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল, কিন্তু বড় দালানগুলো অক্ষত ছিল। আর যে গাছগুলো রোহিঙ্গা গ্রাম বেষ্টন করেছিল সেগুলোও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু এখন, মিও থু গাই গ্রামটির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বড় বড় সরকারি স্থাপনা আর পুলিশ কমপ্লেক্স ছাড়া কিছুই চোখে পড়েনি। এমনকি সেই গাছগুলোও নেই।
আমাদেরকে ইন দিন নামে আরেকটি গ্রামেও নিয়ে যাওয়া হয়। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে ১০ জন বন্দী মুসলিম পুরুষকে হত্যাকাণ্ডের জন্য আলোচিত ওই গ্রামটি। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী অল্প যে কয়টি নির্যাতনের ঘটনা স্বীকার করে এটি তার একটি।
ইন দিন গ্রামের তিন-চতুর্থাংশ বাসিন্দাই ছিলো মুসলিম, বাকিরা রাখাইন বৌদ্ধ। এখন, মুসলিমদের কোনো চিহ্ন নেই। রাখাইনরা চুপচাপ এবং শান্তিপূর্ণ। কিন্তু যেখানে রোহিঙ্গারা থাকত সেখানে গিয়ে দেখা গেল যে, কোন গাছপালা নেই। তার পরিবর্তে রয়েছে কাঁটাতারের বেড়া আর বিশাল সীমান্ত রক্ষী পুলিশের ব্যারাক। রাখাইনের বৌদ্ধ বাসিন্দারা বলছে যে, প্রতিবেশী হিসেবে মুসলিমদের আর কখনোই মেনে নেবে না তারা।
শরণার্থীদের জন্য এটা কী বার্তা দেয়?
২০১৭ সালের সামরিক বাহিনীর সহিংসতার অনেক দিন পরও চলমান ব্যাপক এই ধ্বংসযজ্ঞ ইঙ্গিত দেয় যে, খুব কম সংখ্যক রোহিঙ্গাই আসলে তাদের পূর্বের জীবনে ফিরতে পারবে। বড় আকারে শরণার্থী ফিরিয়ে নেয়ার প্রস্তুতি হিসেবে একমাত্র হ্লা পো কং এর মতো জরাজীর্ণ ট্রানজিট ক্যাম্প এবং কিয়েন চংয়ের মতো পুনর্বাসন শিবিরই দেখানো হচ্ছে।
তবে দু’বছর আগে শরণার্থীরা যে ধরণের মানসিক আঘাতের মধ্য দিয়ে গেছে তা থেকে খুব কম সংখ্যক শরণার্থীই বের হতে পেরেছে এবং তারা আসলে এ ধরনের ভবিষ্যতের আশা করেনি। এ বিষয়টি শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে মিয়ানমারের সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
ইয়াঙ্গুনে ফেরার পথে বাস্তুচ্যূত এক তরুণ রোহিঙ্গার সঙ্গে দেখা হয় আমার। আমাদেরকে বলা হয়েছিল যে, অনুমতি ছাড়া রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারবে না বিদেশি নাগরিকরা।


সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি