শুক্রবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৯
প্রতিবাদ, না প্রলাপ?
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
Published : Monday, 21 October, 2019 at 8:02 PM

প্রতিবাদ, না প্রলাপ?সুস্থ মানুষ কোনো অন্যায় কাজ হতে দেখলে প্রতিবাদ করেন। অসুস্থ মানুষ কোনো কাজ তাদের পছন্দ না হলেই প্রলাপ বকেন। কথাটা আমার নয়। কথাটা মনস্তাত্ত্বিকদের। সম্প্রতি বাংলাদেশে বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার হত্যাকাণ্ডে দলমত নির্বিশেষে দেশের সব মানুষ গভীরভাবে ক্ষুব্ধ হয়েছে এবং কঠোর ভাষায় তার প্রতিবাদ করেছে। কিন্তু বিএনপি নেতাদের, বিশেষ করে, ড. কামাল হোসেনের প্রতিবাদের ভাষা অলাদা। মনস্তাত্ত্বিকদের সংজ্ঞা অনুসারে এটা প্রলাপ। আমি আরেকটু বাড়িয়ে বলছি রাজনৈতিক প্রলাপ। যে প্রলাপের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকে, তাকেই বলা চলে রাজনৈতিক প্রলাপ। আবরার হত্যাকাণ্ডে সারা দেশের মানুষ ফেনীর নুসরাত হত্যাকাণ্ডের মতো গর্জে উঠেছিল। সরকার বাধ্য হয়েছিল নুসরাত হত্যাকাণ্ডের বর্বর ঘাতকদের গ্রেফতার করতে। এমনকি সোনাগাছি থানার ওসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়। এবার আবরার হত্যাকাণ্ডের খবর শুনে সুদূর লন্ডনের এক হাসপাতালের রোগশয্যায় শুয়েও আমি তীব্র শোক, ক্ষোভ ও ঘৃণা অনুভব করেছি। মনে হয়েছে, আমি যদি যুবক হতাম, তাহলে এই বর্বরদের শিরশ্ছেদ আমি নিজ হাতে করতে চাইতাম।
হাসিনা সরকার আবরার হত্যাকাণ্ডে দেশবাসীর শোকক্ষুব্ধ মনোভাব ঠিকই উপলব্ধি করেছে। তাই বর্বর ঘাতকরা বুয়েট ছাত্রলীগের নেতাকর্মী হওয়া সত্ত্বেও তাদের গ্রেফতার করে বিচারে সোপর্দ করতে দেরি করেনি। এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে আন্দোলনকারীদের সব দাবি মেনে নিয়েছে। বুয়েটে সব ধরনের ছাত্র রাজনীতি সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এখন দেখার ইচ্ছা রইলো ধৃত ঘাতকদের সঠিক বিচার ও শাস্তি হয় কি না। যদি না হয়, সে ব্যাপারে দেশবাসীকে সদাজাগ্রত থাকতে হবে। গণজাগরণ মঞ্চের ধাক্কায় যে রকম যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লাকে সঠিক শাস্তি দিতে হয়েছে, তেমনি গণদাবির ধাক্কাতেই আবরার হত্যাকারীদেরও যথোচিত শাস্তি দিতে হবে। আমার ধারণা, হাসিনা সরকার যেহেতু জনগণের সরকার, অতীতে ঢাকার নতুন বিমানবন্দর নির্মাণ, নিরাপদ সড়কের দাবি ইত্যাদি সব আন্দোলনে জনগণের দাবি সর্বাগ্রে মেনে নিয়েছে, তেমনি আবরারের বর্বর হত্যাকাণ্ডে ক্ষুব্ধ দেশের জনগণের ইচ্ছাপূরণ করে ঘাতকদের যথোচিত শাস্তির ব্যবস্থা করতে দ্বিধা করবে না। এখন সরকার ও দেশের সব রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোর দেখার রইলো নুসরাত হত্যা, আবরার হত্যাকাণ্ডগুলোর মতো বর্বর ঘটনা, লজ্জাকর সামাজিক পচন কী করে রোধ করা যায়। এটা ভয়াবহ সামাজিক পচন, এই পচন আমাদের যুবসমাজের মধ্যে নয়, সারা বিশ্বে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই মহামারী প্রতিরোধ করা যাবে না। ব্রিটেনে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ভয়াবহ নাইস ক্রাইম আইন করে এবং পুলিশ দিয়ে বন্ধ করা যাচ্ছে না। আবরার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে রাজনীতির গন্ধ মেশানো থাকলেও এটা সামাজিক পচনের ফল। এর আগেও বুয়েটে হত্যাকাণ্ড হয়েছে। এক তরুণী ছাত্রীকে বন্দুকের গুলিতে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। সেটা ছাত্রলীগ করেনি। করেছিল বিএনপির ছাত্রদল। তখন কেউ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে বলেননি, ‘এই আপনার আদর্শ? আপনার অনুসারী এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। সুতরাং আপনি ক্ষমতা ছেড়ে দিন।’ ছাত্রদলের হাতে নির্মমভাবে নিহত ওই তরুণীর লাশ তখন বুয়েটের প্রাঙ্গণে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। তখন এসব কথা ড. কামালের মুখে শোনা যায়নি। এখন তিনি আবরার হত্যায় একেবারে উন্মাদ।
আবরার হত্যাকাণ্ড দেশে একটি বিরাট সামাজিক আন্দোলনের জন্ম দিতে পারে, যেমন সালাম-বরকতের হত্যাকাণ্ড দিয়েছিল এক বিশাল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের জন্ম। তখন রাজনৈতিক দলগুলো একুশের এই হত্যাকাণ্ডকে দলীয় ফায়দা ওঠানোর কাজে লাগাতে চাননি, বরং মুসলিম লীগ ব্যতীত সব রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দল, ব্যক্তি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের দ্বারা বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল। একুশ শতকের এই দুর্যোগময় মুহূর্তেও আমাদের দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলো এবং শিল্পী-সাহিত্যিক- বুদ্ধিজীবীরা যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ান, সংগ্রাম করেন, তাহলে এই অবক্ষয় বন্ধ হতে বাধ্য। এই আন্দোলনই ভবিষ্যতের আবরারদের জীবনের নিশ্চয়তা দিতে পারে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, ড. কামাল হোসেন ও তার নতুন রাজনৈতিক পার্টনাররা এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের মধ্যে যে সামাজিক পচন নিহিত, সেদিকে দৃষ্টিপাত না করে এটিকে রাজনৈতিক ও দলীয় ইস্যু করতে চেয়েছেন। নির্বাচনে হেরে গিয়ে, সরকারবিরোধী আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে এখন আবরার হত্যাকাণ্ডের মতো একটি মর্মান্তিক বিষয়কে রাজনৈতিক ইস্যু করে তারা ক্ষমতায় যেতে চান। দেশে বিএনপি-জামায়াত আমলে অনেক বড় বড় হত্যাকাণ্ড ও হত্যাপ্রচেষ্টা হয়েছে। হুমায়ুন আজাদের মতো অসংখ্য বুদ্ধিজীবী হত্যা, প্রকাশ্য দিনে-দুপুরে গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমানসহ অসংখ্য মানুষ হত্যা, পিতার কোলে বন্দুকের গুলিতে দু’মাসের শিশু হত্যা, তা নিয়ে মন্ত্রীর ঠাট্টা ‘আল্লার মাল আল্লায় নিয়ে গেছে’ ইত্যাদির সময় ড. কামালের মুখে একটি শোকের বাণীও উচ্চারিত হতে শোনা যায়নি। এখন তিনি শোকে মুহ্যমান। এখন একটি মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডকে রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করতে চান। তাতে ফায়দা বিএনপি-জামায়াতের। তার নিজেরও নয়। ড. কামাল হোসেন সত্যকে ঠেকে রাখতে চান। হাসিনা সরকারের আমলে নুসরাত হত্যার অপরাধীরা দ্রুত ধৃত হয়েছে, বিচারে সোপর্দ হয়েছে। আবরার হত্যাকাণ্ডেও অপরাধীরা ছাত্রলীগের হওয়া সত্ত্বেও দ্রুত তাদের ধরা হয়েছে। কিন্তু বিএনপি আমলের একটি হত্যাকাণ্ডেরও প্রকৃত আসামিদের ধরা হয়নি, বিচার হয়নি। এমনকি ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার আসামিদেরও নয়। ড. কামাল আবরার হত্যাকাণ্ডের দিকে আঙুল নির্দেশ করে শেখ হাসিনার নাম উল্লেখ না করে তার উদ্দেশে বলেছেন, ‘এই আপনার আদর্শ?’ এ কথার জবাবে বলা চলে, শেখ হাসিনা তার পিতার আদর্শ এখনও আঁকড়ে ধরে আছেন। তাই দেশটা একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী ও ঘাতকদের কবল থেকে বেঁচেছে। এই অবক্ষয়ের কালেও হাসিনার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে দীক্ষিত নীতিবান অনুসারী অনেকেই আছেন। ড. কামালের সঙ্গে এখন যারা এসে জুটেছেন, তারা কোন আদর্শবান? বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় নেতাদের হত্যাকারী ও হত্যাকারীদের অনুসারীদের অধিকাংশই এখন তার সহযোগী নয় কি? নিজের দল গণফোরামও কি তিনি আদর্শবান লোকদের নিয়ে গঠন করেছিলেন? মোস্তফা মহসিন মন্টু, যিনি রাজনৈতিক সহযোগী হত্যার দায়ে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন, তিনি কি তাকেই সাধারণ সম্পাদক করে গণফোরাম গঠন করেননি? মন্টু ও মন্টুর ‘আদর্শবান’ সহযোগীদের পাহারাতেই কি গণফোরামের প্রথম দিকের সভাগুলো অনুষ্ঠিত হয়নি?
ড. কামাল রাজনীতিতে স্বচ্ছ ও আদর্শবান মানুষ চান। তাহলে তারেক রহমানের দলের সঙ্গে তিনি হাত মেলালেন কেন? বরং রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা, সন্ত্রাসী ও দুর্নীতিবাজদের কবল থেকে দেশের রাজনীতিকে মুক্ত করার জন্য সব দলের কাছে আহ্বান জানাতে পারতেন সংগঠিতভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার।
আওয়ামী লীগেও এখন রাজনৈতিক অস্বচ্ছতা ঢুকেছে। তথাপি শেখ হাসিনা তার নিজের দলের অপরাধীদেরও যে শাস্তি দেন, তার প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু বিএনপি আমলে তাদের সন্ত্রাসীদের দ্বারা সংঘটিত একটি হত্যাকাণ্ডেরও বিচার হয়নি, অপরাধীদের শাস্তি হয়নি। আবরার হত্যাকাণ্ড নিশ্চয়ই একটি নিষ্ঠুর বর্বরতা। অপরাধীদের ধরা হয়েছে। নিশ্চয়ই তাদের বিচার ও শাস্তি হবে। কামাল হোসেন সাহেবরা একটু অপেক্ষা করুন। যদি এই হত্যাকাণ্ডের বিচার ও ঘাতকদের শাস্তি না হয়, তাহলে দেশের বর্তমান জাগ্রত জনগণ চুপ করে বসে থাকবে না।


সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি