বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট, ২০২০
সংবাদপত্রের বর্তমান সংকটের আসল কারণ কী?
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
Published : Sunday, 24 November, 2019 at 8:14 PM

মুদ্রিত সংবাদপত্রের জন্য এটাকে একটা সংকটকাল বলা যেতে পারে। রেডিও ও টেলিভিশন আগে প্রিন্ট মিডিয়ায় যে গুরুত্ব তেমন কমাতে পারেনি, বর্তমানের আরো উন্নত প্রযুক্তি, যেমন ইন্টারনেট, ওয়েবসাইট, অনলাইন প্রভৃতি সেই গুরুত্ব কমিয়ে দিয়েছে। সিনেমা দেখতে এখন আর কেউ সিনেমা হলে যায় না। ঘরে বসেই সিনেমা দেখে। মোবাইল ফোনেও এখন সিনেমা দেখা যায়, খবর জানা যায়।
নব নব প্রযুক্তি বিশ্বকে কোথায় নিয়ে যাবে এখন তা কেউ কল্পনা করতেও পারে না। বিশ্বের রাষ্ট্রনায়কেরা, যেমন ট্রাম্প, মোদি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভাষণ ও বিবৃতির বদলে টুইট করে সাধারণ মানুষকে তাদের বক্তব্য জানান। তাদের বিরুদ্ধে সমালোচনার জবাব দেন। সংবাদপত্রের সংকটকাল কতটা গুরুতর তা এখন বোঝা যায় ব্রিটেন, আমেরিকাসহ ইউরোপের জাতীয় সংবাদপত্রগুলোর অবস্থা দেখে। ব্রিটেনের সর্বাধিক প্রচারিত ব্রডসিট সংবাদপত্র, যার সার্কুলেশন ১১ লাখের ওপরে। সেই ডেইলি টেলিগ্রাফের মালিকানা পরিবর্তন হচ্ছে। কারণ বর্তমান মালিকেরা চালাতে পারছেন না। গার্ডিয়ান ছোটো সাইজের কাগজ হয়ে গেছে। পত্রিকা বাঁচিয়ে রাখার জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে চাঁদা তুলছে।
আমেরিকায় নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকার কলেবর কমেছে। সুবিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের আগের সুদিন আর নেই। পৃষ্ঠা কমিয়ে কায়ক্লেশে টিকে আছে। ভারতে বহুল প্রচারিত দৈনিকগুলো অস্তিত্ব হারানোর আতঙ্কে আছে। বাংলাদেশে এই অবস্থাটা এখনো দৃষ্টিগোচরে নয়। তবে ‘সর্বাধিক প্রচারিত বাংলা দৈনিক’ হওয়ার দাবিদার পত্রিকাটিতে কিছুকাল আগেও যেভাবে সাংবাদিক ও অন্যান্য স্টাফ ছাঁটাই চলেছে, তার সার্কুলেশন ধা ধা করে নামছে, তাতে বাংলাদেশেও প্রিন্ট মিডিয়ার অবস্থা কী তা অনুমান করা যায়।
নবপ্রযুক্তির বিপুল বিস্তারের ফলে সংবাদপত্র পাঠকের সংখ্যা দিন দিন কমছে। যে পত্রিকায় পাঠক কম, তাতে বিজ্ঞাপন দেবেন কোন বিজ্ঞাপনদাতা? তারা টেলিভিশন, ইন্টারনেট বেছে নিয়েছেন। তার গ্রাহক বিপুল। বাংলাদেশে তো একেবারে গ্রাম পর্যায়ে মোবাইল ফোনের বিস্তার ঘটেছে। এখন ঘটনা ঘটার কয়েক মিনিটের মধ্যে যে খবর ছড়িয়ে পড়ে, তা পরদিন কোনো পত্রিকায় পড়ার জন্য কে অপেক্ষা করবে?
তারপর আছে কোনো কোনো দেশে সরকারের কার্যক্রম, তারা বিরোধী মতের সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিতে চান না। প্রাইভেট বিজনেসকেও ঐ পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে নিষেধ করেন। বাংলাদেশে এখন বড়ো ব্যবসায়ীর অধিকাংশই রাজনীতিক হয়ে গেছেন। তারা নিজেদের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী স্বার্থের অনুকূলে প্রচারিত সংবাদপত্র ছাড়া অন্যমতের বা নিরপেক্ষ সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিতে চান না। বরং সেই বিজ্ঞাপনের টাকায় নিজস্ব হাউজ-নিউজ পেপার বের করেন। স্বাধীন সাংবাদিকতা সেখানেই মারা যায়। দলীয় ও পক্ষপাতদুষ্ট খবর পড়ার জন্য এ যুগের পাঠক আর সংবাদপত্র পাঠ করতে চায় না। ফেসবুকে অনেক মিথ্যা ও উদ্দেশ্যমূলক খবর প্রচারিত হওয়া সত্ত্বেও সেসব উত্তেজক ও অতিরঞ্জিত খবর পাঠ করতে আগ্রহ দেখায়।
সম্প্রতি সাংবাদিক মশিউল আলম ঢাকার একটি দৈনিকে বিশ্বব্যাপী মুদ্রিত সংবাদপত্রের এই সংকট সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তার আলোচনাটি ভালো এবং তার অধিকাংশ অভিমতের সঙ্গেই আমি সহমত পোষণ করি। তবে তার কথার সঙ্গে আমার কিছু কথা যোগ করতে চাই। কিছুদিন আগে ‘ডেইলি স্টারের’ সম্পাদক মাহফুজ আনাম প্রিন্ট মিডিয়ার সংকট সম্পর্কে তার অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তার ব্যক্ত অভিমত মশিউল আলমও তার লেখায় উদ্ধৃত করেছেন। এই উদ্ধৃতিতে মাহফুজ আনামের অভিমত সমর্থন করা হয়েছে; কিন্তু মশিউল আলম বোধ হয় বুঝতে পারেননি, সংবাদপত্রের বর্তমান সংকটকালের একটি বড়ো কারণ বিজ্ঞ মাহফুজ আনাম এড়িয়ে গেছেন।
মাহফুজ আনামের আলোচনায় সংবাদপত্রে সংকট দেখা দেওয়ার সব কারণই ব্যক্ত হয়েছে। এমনকি ঠারেঠোরে বাংলাদেশের হাসিনা সরকারের নাম উল্লেখ না করে সরকারের পীড়ন-নিপীড়নে সাংবাদিক স্বাধীনতা কীভাবে পিষ্ট হচ্ছে এবং তাতেও যে সংবাদপত্রের সার্কুলেশন কমছে তাও বোঝাতে চেয়েছেন। এই সমালোচনার লক্ষ্য যে হাসিনা সরকার তা বুঝতে কষ্ট হয় না।
মাহফুজ আনাম নাম ধরে হাসিনা সরকারের সমালোচনা করলে আপত্তির কিছু ছিল না। কিন্তু যে সত্যটি তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে অথবা অনিচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে গেছেন, তা হলো বিশ্বব্যাপী বিশেষ করে এশিয়ার অধিকাংশ দেশে সংবাদপত্রের কাটতি কমার একটা বড়ো কারণ, সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর ও মন্তব্যে মানুষের আস্থার অভাব, তার ক্রেডিবিলিটির অভাব। বেশির ভাগ পাঠক এখন সংবাদপত্রের খবর এবং মতামত সম্পর্কে সন্দিহান।
এটা দেখা গেছে ব্রিটেনের অতীতের কয়েকটি সাধারণ নির্বাচনে। মারডোকের টাইমস কাগজটিকে বলা হতো কিং মেকার। অর্থাত্ এই কাগজ ব্রিটেনে, অস্ট্রেলিয়ায় যে দলকে সমর্থন করে সে দল ক্ষমতায় যায়, যে সরকারকে সমর্থন করে না, তার পতন ঘটে। অসত্য খবর প্রচার এবং বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালিয়ে এই কাগজ তার ক্রেডিবিলিটি হারায়। লেবার দলের নেতা নির্বাচনে বামপন্থি করবিনের বিরুদ্ধে ক্রমাগত মিথ্যা প্রচার করা সত্ত্বেও করবিন বিপুল ভোটে তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করে দলের নেতা নির্বাচিত হন। টাইমস গ্রুপের ক্রমাগত অসত্য প্রচারণা সত্ত্বেও করবিন এখনো লেবার পার্টির নেতার পদে বহাল আছেন।
বাংলাদেশেও সংবাদপত্রের ক্রেডিবিলিটি হারানোর উদাহরণ আছে। প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টার—এই দুটি বাংলা ও ইংরেজি দৈনিক নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রচারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রকাশিত হয়। ফলে পাঠকেরা বিপুলভাবে দৈনিক পত্রিকাটির ক্রেতা হয় এবং দেশের রাজনীতিতে পত্রিকা দুটি যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে। এই প্রভাব ২০০১ সালের নির্বাচনে কাজ দেয়। এই নির্বাচনে যে বিএনপি-জামায়াতের বিরাট জয় হয়, তার পেছনে দেশি-বিদেশি কারসাজির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল নিরপেক্ষতার নামে এই পত্রিকা দুটির কৌশলী আওয়ামী লীগ বিরোধী প্রচারণা। আওয়ামী লীগের নির্বাচনে পরাজয়ের এটি একটি বড়ো কারণ। এই কৌশল পরবর্তীকালে আর কাজ দেয়নি। পত্রিকা দুটি দেশবাসীর কাছে এক্সপোজড্ হয়ে যায়। ধরা পড়ে পত্রিকা দুটির মালিক একটি বিগ বিজনেস হাউজ। এই হাউজ বিএনপির সঙ্গে সম্পর্কিত। দুটি পত্রিকাতেই অনেক সত্ সাংবাদিক আছেন। কিন্তু তারা স্বাধীনভাবে লিখতে পারেন না। স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে লিখতে গেলে তাদের চাকরি যায়। আমার এক বন্ধু সাংবাদিককে জানি। আগে “সংবাদে” ছিলেন। পরে যুগান্তরে আসেন। সেখান থেকে প্রথম আলোতে। আগে ছিলেন মুক্ত এবং নিরপেক্ষ কলামিষ্ট। এখন প্রথম আলোতে সম্পাদকের সিনিয়র মুনশি হয়ে সম্পাদকের বক্তব্য নিজের নামে লেখেন।
সেই যে ২০০১ সালের নির্বাচনে কাগজ দুটি ক্রেডিবিলিটি হারিয়েছে তা আর ফেরত পায়নি। পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে একই ভূমিকা নিয়ে পত্রিকা দুটি আওয়ামী লীগের বিজয় ঠেকাতে পারেনি। দেশে তাদের কাটতি হয়তো তেমন কমেনি। কিন্তু ক্রেডিবিলিটি আর নেই। সংবাদপত্র এই ক্রেডিবিলিটি শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বে হারিয়েছে। কারণ বিশ্ব জুড়ে এখন বিগ বিজনেস হাউজগুলো কাগজের মালিক। তাদের স্বার্থে কাগজগুলোকে লিখতে হয়। ইরাক ও ইরান যুদ্ধের বা আফগানিস্তান সমস্যায় টাইমস, টেলিগ্রাফ সত্য খবর দেয়, সঠিক মতামত দেয় তাদেরই অধিকাংশ পাঠক তা বিশ্বাস করে না। প্রিন্টিং ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া বহুদিন বিপুলভাবে বিশ্বজনমত প্রভাবিত করে রেখেছে। তারা সঠিক খবর দিলে এবং সঠিকভাবে মতামত দিলে ট্রাম্পের মতো প্রেসিডেন্ট কী করে আমেরিকায় নির্বাচিত হয়? মানুষের বা পাঠকের আস্থা তাই সংবাদপত্রের ওপর নষ্ট হয়েছে। সংবাদপত্রের বর্তমান সংকটের তাও একটা বড়ো কারণ।
একথা সত্য, কোনো কোনো আফ্রো এশিয়ান দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বড়ো শত্রু ছিল সরকার। বাংলাদেশে তো সংবাদপত্রের অস্তিত্বই নির্ভরশীল ছিল সরকারি বিজ্ঞাপনের ওপর। সরকার বিজ্ঞাপন না দিলে পত্রিকাটির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কষ্টকর হতো। ফলে সরকারের পক্ষে সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল। তাছাড়া প্রত্যক্ষ নিপীড়নও সরকার চাইলে চালাতে পারত। বর্তমানে গ্লোবালাইজেশন ও মার্কেট ইকোনমি এবং অনুন্নত দেশগুলোতে শিল্পোন্নয়নের ফলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণে সরকারি প্রভাব অনেক কমে গেছে।
পনেরো-বিশ বছর আগেও খালেদা জিয়ার সরকার ঢাকার একটি দৈনিকের মালিক ও সম্পাদকসহ কয়েকজন সাংবাদিককে হাতে হাতকড়া দিয়ে জেলে নিতে পেরেছেন, পত্রিকাটির বিজ্ঞাপন কমিয়ে, সরকারি অফিস-আদালতে, বিমানের ফ্লাইটে তার প্রবেশ নিষিদ্ধ করে তাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পেরেছেন। বর্তমান হাসিনা সরকারের আমলে তা সম্ভব নয়। এই সরকার গণতান্ত্রিক এবং জনসাধারণের কাছে তার জবাবদিহি রয়েছে। তার ওপর বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার আন্দোলন এত শক্তিশালী যে সরকারের ইচ্ছা থাকলেও এই নিয়ন্ত্রণ ও নিপীড়ন তারা চালাতে পারে না।
সর্বোপরি সংবাদপত্রে প্রধান বিজ্ঞাপনদাতা এখন সরকার নয়, এই বিজ্ঞাপনদাতা বিগ বিজনেস। সব ধরনের সংবাদপত্রের মালিকানাই এখন বিগ বিজনেসের কুক্ষিগত। সংবাদপত্র চালিত হয় তাদের স্বার্থে এবং তাদের নিয়ন্ত্রণে। তাই সব ধরনের মিডিয়ার ক্রেডিবিলিটি ফিরে পেতে হলে সাংবাদিকদের যুদ্ধ করতে হবে মূলত বিগ বিজনেসের তথা ক্যাপিটালিজমের বিরুদ্ধে। এই যুদ্ধের জন্য উন্নত-অনুন্নত নির্বিশেষে বিশ্বের সাংবাদিকেরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারবেন কি? তাদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত না হলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নামকাওয়াস্তে থাকবে। যেমন এখন আছে। এই সাংবাদিকতার ক্রেডিবিলিটি উদ্ধার করা যাবে না।
বাংলাদেশে মাহফুজ আনাম একটি বিগ বিজনেস হাউজের দৈনিকের সম্পাদক হওয়াতেই সম্ভবত প্রিন্টিং মিডিয়ার বর্তমান সংকটের অন্যান্য কারণের সঙ্গে বিগ বিজনেস হাউজের দৌরাত্ম্যের কারণে সংবাদপত্রের ক্রেডিবিলিটি হারানোর সমস্যাটি উল্লেখ করতে পারেননি। আমি এই সমস্যাটির কথা তাকে স্মরণ করিয়ে দিলাম মাত্র।


সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি