মঙ্গলবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২০
যুবলীগের যৌবন আবার ফেরানো যাবে কি?
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
Published : Monday, 25 November, 2019 at 9:06 PM

যুবলীগের যৌবন আবার ফেরানো যাবে কি?শনিবার (২৩ নভেম্বর) ঢাকায় অনুষ্ঠিত হল বাংলাদেশ যুবলীগের সপ্তম জাতীয় কংগ্রেস। এ উপলক্ষে যুবলীগের পক্ষ থেকে সংগঠনটির আদর্শ-উদ্দেশ্য প্রচারের জন্য একটি সংকলনও প্রকাশ করা হয়েছে। এই সংকলনে একটা লেখা দেয়ার জন্য আমাকে ঢাকা থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছিল।
অনুরোধটি জানানো হয়েছে আমার অনুজপ্রতিম সাংবাদিক বন্ধু মাহবুব কামালের মাধ্যমে। আমি অনুরোধটি রাখতে চেয়েও রাখতে পারিনি। কারণ সাম্প্রতিক অসুস্থতার ধকল আমি এখনও কাটিয়ে উঠতে পারিনি। তাই ঢাকার বিভিন্ন দৈনিকে সপ্তাহের কলামগুলোই নিয়মিত লিখে উঠতে পারি না। তার ওপর অন্য লেখার চাপ এখন আর বহন করতে পারি না। যুবলীগের বর্তমান কার্যকলাপে আমি ক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ। যেমন ক্রুদ্ধ ছাত্রলীগ নিয়ে। আমিও ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের কর্মী ছিলাম। ভাষা আন্দোলনে ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে জেল খেটেছি। সেই ছাত্রলীগের বর্তমান পচন দেখে আমার দুঃখ হয়। যুবলীগেরও আমি একজন শুভাকাঙ্ক্ষী।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই ১৯৭২ সালের ১১ নভেম্বর তখনকার যুবনেতা বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনি যুবলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠা দিবসের সম্মেলনে তিনি আমাকে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আমি সম্মেলনে উপস্থিত ছিলাম।
সেই সম্মেলনে উপস্থিত যুবকদের চোখে যে আশা ও উদ্দীপনা লক্ষ করেছি তা এখন প্রায় নির্বাসিত।
স্বাধীনতা লাভের মাত্র চার দশকের মধ্যে বাংলাদেশের যুবসমাজে এত বড় অবক্ষয় দেখা দিতে পারে, তা আমি কখনও কল্পনাও করতে পারিনি। তবু আমি ছাত্রলীগ ও যুবলীগের পুনর্জাগরণের ওপর আস্থাশীল।
স্বাধীনতার ৩ বছরের মাথায় দুটি শক্তিশালী ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগ মিলে জাতীয় ছাত্রলীগের জন্ম হয় এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী যুবসমাজের একটা বড় অংশকে নিয়ে যুবলীগের জন্ম হয় ১৯৭২ সালে।
তখন বাংলাদেশের সোনালি ভবিষ্যতের কথা ভেবে অনেক আশা পোষণ করেছি। এই আশা ভেঙে যায় বন্দুকের জোরে ক্ষমতা দখলকারী জিয়াউর রহমানের আমলে। এ সময় লোভ-লালসা, অর্থ ও ক্ষমতার প্রলোভন দেখিয়ে দেশের যুবসমাজে পচন ধরানো শুরু হয়।
এই পচন দ্রুত ছাত্রলীগ ও যুবলীগেও সংক্রমিত হয়। জিয়াউর রহমানের কবল থেকে দেশ মুক্ত হয়েছে। কিন্তু তার ছড়ানো বিষ থেকে দেশ, বিশেষ করে যুবসমাজ এখনও মুক্ত হতে পারেনি।
ভবিষ্যতের কোনো ইতিহাসবিদ অবশ্যই স্বীকার করবেন, জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে বড় অপরাধ বন্দুকের জোরে দেশের শাসন ক্ষমতা দখল করা নয়, তার সবচেয়ে বড় অপরাধ, তার শাসনামলে দেশের মানুষের, বিশেষ করে যুবসমাজের নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়া হয়েছিল, যা এখনও জোড়া লাগানো সম্ভব হচ্ছে না।
সম্প্রতি ক্যাসিনো কর্মকাণ্ডে, বুয়েটে ছাত্র হত্যায় যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতাই তার প্রমাণ। আশার কথা, এই পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। ছাত্রলীগের নেতৃত্বে কিছুদিন আগেই পরিবর্তন ঘটিয়েছেন, এখন যুবলীগের নেতৃত্বেও বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটালেন।
গত শনিবার যুবলীগ সম্মেলনে যুবলীগের চেয়ারম্যান পদে শেখ হাসিনার মনোনয়ন পেয়েছেন সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফজলুল হক মনির বড় ছেলে শেখ ফজলে শামস পরশ। তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন যুবলীগের ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি মাইনুল হাসান খান নিখিল। পরশ এতদিন ছিলেন রাজনীতিবিমুখ। শিক্ষকতা নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন দেশে এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষা লাভ করেছেন এই পরশ।
তার ছোট ভাই ব্যারিস্টার তাপস এখন একজন রাজনীতিক। কিন্তু পরশ তা নন। খবরে বলা হয়েছে, তিনি তার আত্মীয়া শেখ হাসিনার অনুরোধে রাজনীতিতে এসেছেন। সংগঠনটিতে নতুন রক্ত সঞ্চালনই এর প্রধান উদ্দেশ্য। অনেকের ধারণা, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারতের যুব কংগ্রেসের আদলে যুবলীগ গঠন করা হয়। কথাটা সর্বাংশে সত্য নয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার বহু আগেও ইয়ুথ লীগ নামে একটি শক্তিশালী যুব সংগঠন ছিল।
তার নেতা ছিলেন তখনকার যুবনেতা ইমাদউল্লা লালা মিয়া, অলি আহাদ, মোহাম্মদ তোহা, তোসাদ্দুক আহমদ, রুহুল আমিন প্রমুখ।
বঙ্গবন্ধুও এই ইয়ুথ লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কিনা আমার জানা নেই। সংগঠনটি ছিল বাম ধারার এবং ভাষা আন্দোলনের গোড়ার দিকে তা শক্ত ভূমিকা রেখেছে। সংগঠনটি স্বাধীনতার বহু আগে ভেঙে যায়।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু একদিন শেখ মনিকে বলেন, ছাত্রজীবন পেরিয়েছে অথচ যৌবন পেরোয়নি এরকম বহু যুবক এখন আদর্শহীন, লক্ষ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে। এখন অলস ও অকর্মণ্য জীবনে লক্ষ্যহীন হয়ে তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। নানা উচ্ছৃঙ্খল কাজে জড়িত হচ্ছে। এদের মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে দেশ ও জাতি গঠনের কাজে লাগাতে পারলে একটি যুবশক্তি তৈরি হবে, যে শক্তির ভেতর থেকে দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব বেরিয়ে আসবে। দেশ ও সমাজের ভবিষ্যতের রূপকার এই যুবসমাজ। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে শেখ ফজলুল হক মনি যুবলীগ গঠন করেন এবং অল্পদিনের মধ্যে যুবলীগ একটি শক্তিশালী যুব প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। যার প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন শেখ মনি নিজে। সত্য কথা বলতে কী, যুবলীগের শক্তি ও সাফল্যের প্রমাণ পাওয়া গেছে শেখ ফজলুল হক মনি এবং তার ছোট ভাই শেখ ফজলুল করিমের নেতৃত্বের আমলে। সংগঠনটির পতন শুরু হয় অনেক পরে- লোভী ও অথর্ব নেতৃত্বের কারণে।
আজ তার সম্পর্কে যত কথাই বলা হোক, যুবলীগের শক্তি ও সুনাম অক্ষুণ্ণ ছিল শেখ ফজলুল করিম সেলিমের নেতৃত্বের আমলেও। তিনি বড় ভাইয়ের প্রতিষ্ঠিত সংগঠনটির সুনাম ধরে রেখেছিলেন। এখন তার বড় ভাইয়ের বড় ছেলে শেখ পরশ যদি পিতার সংগঠনের সাফল্য ও সুনামকে পুনরুদ্ধার করতে পারেন, তাহলে তার শহীদ পিতার আত্মা শান্তি পাবে। ভয়, শেখ ফজলে শামস পরশ একজন শিক্ষাবিদ। তিনি রাজনীতিক নন। রাজনীতিতে তিনি নবাগত। তার অনভিজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে দলের দুষ্ট নেতারা না আবার তার হাতে তামাক সেবন করতে চায়। পরশ নিজে রাজনীতিক না হন, রাজনৈতিক পরিবারে, রাজনৈতিক পরিবেশে তার জন্ম। তার রাজনৈতিক অনভিজ্ঞতাকে সহজেই পুষিয়ে নিয়ে তিনি যুবলীগে প্রাণ ফিরিয়ে আনতে পারবেন আশা করা যায়। এই আশা নিয়ে তাকেসহ যুবলীগের নতুন নেতৃত্বকে অভিনন্দন জানাই। এই সত্য প্রমাণিত হয়েছে যে, আফ্রো-এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ছাত্র ও যুবসমাজই দেশ ও সমাজের অগ্রগতির পথিকৃৎ এবং ভবিষ্যতের রূপকার। সমাজ ও দেশের অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি তারা। বাংলাদেশে দেখা গেছে, ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতার যুদ্ধ পর্যন্ত সব আন্দোলন ও সংগ্রামে যুবসমাজ নেতৃত্ব না দিলে সেগুলো সফল হতো না।
রাজনৈতিক দলগুলো যতই প্রগতিশীল হোক, তাদের নেতৃত্ব বার্ধক্য, জড়ত্ব, রক্ষণশীলতার কারণে পশ্চাৎমুখী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সহজে মুক্ত হতে পারে না। এটা বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ও কমিউনিস্ট দলগুলো সম্পর্কেও সত্য।
ভাষা আন্দোলনে দেখা গেছে, বায়ান্নর ২১ ফেব্রুয়ারি দুপুরের ১৪৪ ধারা ভঙ্গ ও মিছিল করার ব্যাপারে আওয়ামী লীগের বয়স্ক নেতারা ছিলেন ঘোর বিরোধী। তরুণ নেতা শেখ মুজিব জেলে বসে ১৪৪ ভাঙার নির্দেশ ছাত্রলীগের নেতাদের কাছে না পাঠালে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলার বৈঠকে ছাত্রলীগ এই ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল করার পক্ষে ভোট না দিলে রক্তে রঞ্জিত ঐতিহাসিক ২১ ফেব্রুয়ারি সফল হতো না। ভাষার অধিকারও আদায় করা যেত না।
স্বাধীনতা যুদ্ধেরও একই ইতিহাস। স্বাধীনতা নয়, কেবল ছয় দফা দাবি উত্থাপনের মুখেই আওয়ামী লীগের অধিকাংশ প্রবীণ নেতা দল ছাড়েন। আরও কিছু নবীন-প্রবীণ নেতা দলত্যাগী হন স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতির খবর শুনেই।
বঙ্গবন্ধুকে কয়েকজন যুবনেতার একটি নিউক্লিয়াসের সাহায্য নিয়ে স্বাধীনতার যুদ্ধে নামতে হয়েছে। দলের অনেক নেতা যখন কঠোর নিরাপত্তায় বাস করছেন, তখন বঙ্গবন্ধু শত্রুপক্ষের জেলে ফাঁসির মামলার আসামি এবং এই যুবশক্তি মুক্তিযোদ্ধা হয়ে অস্ত্র হাতে রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছেন, দেশ স্বাধীন করেছেন।
স্বাধীনতার পর ছাত্রলীগের পুনর্গঠন এবং যুবলীগের গঠন এই মুক্তিযোদ্ধা যুবসমাজের দ্বারাই হয়েছে। তারপর জিয়া-এরশাদ-খালেদার স্বৈরাচারী শাসনামলেও অকুতোভয়ে সংগ্রাম করেছেন, নির্যাতিত হয়েছেন এই ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতা ও কর্মীরা।
দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ও রক্ষায় এই দুটি সংগঠনের অবদান অতুলনীয়। এমন গৌরবময় অতীতের উত্তরাধিকার বহন করছে যে দুটি সংগঠন, সাম্প্রতিককালে তাদের পতন ও পচন দুঃখজনক। দেখা যাক, যুবলীগের নতুন নেতৃত্ব ধ্বংসাবশেষ থেকে এই সংগঠনটিকে কতটা উদ্ধার করতে পারে। যু
বলীগ যদি সংশোধিত ও সংগঠিত হয়, তাহলে দেশের যুবসমাজও সংশোধিত ও সংগঠিত হবে। যুবলীগের নতুন নেতৃত্বকে আরেকবার অভিনন্দন।


সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি