শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০
যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের হঠকারী খেলা
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
Published : Sunday, 5 January, 2020 at 8:32 PM

মাত্র কয়েক দিন আগে এক স্কটিশ সাংবাদিকের মুখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশংসা শুনে তা নিয়ে আমার কলামে আলোচনা করেছিলাম। স্কটিশ সাংবাদিক বলেছিলেন, ট্রাম্পকে এজন্যেই প্রশংসা করতে হয় যে, তিনি যুদ্ধের হুমকি দেন, যুদ্ধ করেন না। বরং যুদ্ধ থেকে সরে আসেন। প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময় তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল, আমেরিকাকে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের অবিরাম যুদ্ধ (বহফষবংং ধিৎ) থেকে সরিয়ে আনবেন। ট্রাম্প সম্পর্কে এই অভিমতের সঙ্গে আমিও সহমত ঘোষণা করেছি। কিন্তু ইংরেজি নববর্ষ ২০২০ সালের শুরুতেই ইরাকের বাগদাদ বিমানবন্দরে আমেরিকার আকস্মিক ড্রোন হামলা এবং ইরানের অত্যন্ত প্রভাবশালী জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা আমাদের এ বিশ্বাসকে টলিয়ে দিয়েছে। তবে ট্রাম্প পাগল নন। তিনি আকস্মিক সিদ্ধান্ত নিয়ে এ কাজটি করেছেন, তা-ও নয়। যে যা-ই ভাবুন, তিনি অত্যন্ত চিন্তাভাবনা করেই এ কাজটি করেছেন। তার মাথার ওপরে ইম্পিচমেন্টের তলোয়ার ঝুলছে। সামনের বছর প্রেসিডেন্ট পদের নির্বাচন। তিনি এক গুলিতে দুই পাখি মারতে চেয়েছেন। রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠ সিনেটে তিনি এখন অবশ্যই ইম্পিচমেন্ট থেকে মুক্ত হবেন। অন্যদিকে আমেরিকার শত্রু ইরানের সবচেয়ে প্রভাবশালী জেনারেলকে হত্যা করে আমেরিকার হোয়াইট ভোটাদের কাছে শক্ত নেতা হিসেবে হিরো থাকবেন। তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার জয় নিশ্চিত করেছেন। খবরে প্রকাশ, সোলেইমানিকে হত্যার সিদ্ধান্ত ট্রাম্প এককভাবে নিয়েছেন। হোয়াইট হাউজের পরামর্শদাতাদের সঙ্গে এই ব্যাপারে পরামর্শ করেননি। ব্রিটেনসহ মিত্র দেশগুলোকেও তার সিদ্ধান্তের কথা আগে জানাননি। তিনি তার অবসর প্রহণের বিলাশবহুল বাড়িতে বসে সিদ্ধান্তটি নিয়েছেন এবং তা কার্যকর করেছেন। তার এই হঠকারিতার একমাত্র ইসরাইল ছাড়া কোনো মিত্র দেশ সরাসরি সমর্থন জানাতে পারেনি। বরং কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ট্রাম্পের এই বিপজ্জনক ও অদূরদর্শী কাজ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের বিস্তার ঘটাবে এবং বিশ্বশান্তি বিপন্ন করবে। আমার এই লেখার সময় পর্যন্ত এই হামলা ও হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে সারা বিশ্বের প্রতিক্রিয়া জানতে পারিনি। তবে অনুমান করা যায়, ট্রাম্পের এই হঠকারিতা বিশ্বের শান্তিকামী কোনো দেশের সমর্থন পাবে না। রাশিয়ার পুতিন তো ইতিমধ্যেই ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে টেলিফোন আলাপে এই ড্রোন হামলা ও হত্যাকাণ্ডে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মার্কিন ড্রোন হামলায় মারা গেছেন ছয় জনের বেশি শিয়া সম্প্রদায়ের লোক। তাদের মধ্যে এক জন হলেন, মার্কিনবিরোধী শিয়া সংগঠন দাওয়া পার্টির ইরাকি নেতা জামাল জামর মোহাম্মদ আলি ইব্রাহিমি। তিনি তার শিষ্যদের কাছে আবু মাহদি আল মোহানদিন নামে পরিচিত ছিলেন। নিহত হওয়ার মাত্র কিছুদিন আগে তিনি ইরানের সমর্থক এক শিয়া সমাবেশে বলেছেন, ‘আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু করবে, আমরা তা শেষ করব।’ এই বক্তৃতায় মধ্যপ্রাচ্যেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কবর খনন হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন। পশ্চিমা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, ‘ইম্পিচমেন্ট থেকে মুক্তি লাভ এবং দ্বিতীয় দফা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য ট্রাম্পের এটাই সবচেয়ে বড়ো জুয়া খেলা। এই খেলায় তিনি সাময়িকভাবে লাভবান হবেন। ইম্পিচমেন্ট থেকে মুক্ত হয়ে তিনি আগামী বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেন কিন্তু বিশ্বে এমন একটি যুদ্ধের বিস্তার ঘটিয়ে যাবেন, যাতে কোনো পক্ষই জয়ী হবে না কিন্তু বিশ্বে পশ্চিমা স্বার্থ—বিশেষ করে মার্কিন আধিপত্য ও স্বার্থের গুরুতর ক্ষতি হবে। ট্রাম্প এতটাই স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিক যে, আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট পদে তার অবস্থান আমেরিকা ও পশ্চিমা স্বার্থের গুরুতর ক্ষতি করবে। সোলেইমানি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের স্বার্থ ও প্রভাব রক্ষার সবচেয়ে সফল জেনারেল ছিলেন। তার মৃত্যু ইরানের এই স্বার্থ ও প্রভাবের ওপর গুরুতর আঘাত হানবে। আবু মাহাদি ছিলেন ইরাকে মার্কিনবিরোধী এবং ইরান সমর্থক শিয়া সম্প্রদায়ের নেতা। তার শূন্যস্থান কে পূর্ণ করবে তা নিয়ে সমস্যা দেখা দেবে। পশ্চিমা মিডিয়াগুলোরও অভিমত, একজন ইরানি জেনারেলকে এভাবে হত্যা করা শুধু ইরানকে গুরুতর প্রোজেকেশন দেওয়া নয়, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। ইরান সহজভাবে এই হামলাকে নেবে না। আমেরিকা সোলেইমানিকে হত্যায় যুক্তি দেখিয়েছে, তিনি ইরাক ও সিরিয়ায় গণহত্যার জন্য অপরাধী। সম্প্রতি তিনি ইরাকে বিদেশি কূটনীতিকদের আবাসে হামলা চালানোর চক্রান্ত আঁটছিলেন। ইতিপূর্বে ইরানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের (হরমুজ প্রণালিতে হামলাসহ) সত্যতা যেমন প্রমাণ করতে পারেনি ওয়াশিংটন, তেমনি কূটনীতিকদের আবাসে হামলার চক্রান্ত করারও কোনো প্রমাণ দিতে পারবে বলে কেউ মনে করেন না। তবে মার্কিন কর্তৃপক্ষ এই কূটনীতিকদের আকস্মিকভাবে অন্যত্র সরানোর কথা জানিয়েছেন এবং সেনাবাহিনীর সংখ্যা ৩ হাজার বাড়ানোর ব্যবস্থা নিয়েছেন। আমেরিকার এই উসকানিমূলক হামলার মুখে ইরান নিষ্ক্রিয় নয়। জেনারেলের মৃত্যুতে তেহরানে তিন দিনব্যাপী শোক দিবস পালন করা হচ্ছে। ইরান ঘোষণা করেছে, তারা এই হত্যাকাণ্ডের কঠোরতম প্রতিশোধ নেবে। এই প্রতিশোধ কী ধরনের হতে পারে, তা নিয়ে পশ্চিমা মিডিয়ায় স্পেকুলেশন চলছে। ইরান প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইরাকে যে ৫ হাজার মার্কিন সৈন্য অবস্থান করছে, তার ওপর প্রচণ্ড হামলা চালাতে পারে। ইরাক সরকারের আমন্ত্রণেই এই মার্কিন সেনাবাহিনী ইরাকে মোতায়েন রাখা হয়েছে দেশটির নিরাপত্তার স্বার্থে। এখন ইরাক সরকার এই সৈন্যদের তাদের ভূমি থেকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিতে পারে। তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে আবার যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠতে পারে।
দ্বিতীয়ত : ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে এটমিক গবেষণা-সংক্রান্ত ইরানের যে আলোচনা শম্ভুক গতিতে এগোচ্ছে, তা একেবারেই বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তৃতীয়ত : মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো স্থানে মার্কিন স্বার্থের ওপর ইরান হামলা চালাতে পারে। আমেরিকা সেই পালটা হামলার মুখে নিশ্চুপ থাকতে পারবে না। তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে বড়ো ধরনের যুদ্ধ বাধবে। যদি যুদ্ধ বাধে, কোনো পক্ষই জয়ী হতে পারবে না। পঞ্চাশের দশকে কোরিয়ার যুদ্ধে জয়ী হতে না পেরে আমেরিকা যেমন ভারতকে মধ্যস্থতার জন্য ডেকে এনে পানমুনজন শহরে উত্তর কোরিয়া ও চীনের সঙ্গে শান্তি বৈঠকে বসে যুদ্ধবিরতি ঘটিয়েছিল, তেমনি ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধেও জয়ী হতে না পারলে জাতিসংঘ বা অন্য কোনো দেশের মধ্যস্থতায় (সম্ভবত রাশিয়ার) যুদ্ধবিরতি ঘটাতে পারেন ট্রাম্প। এমনও হতে পারে, ধূর্ত ট্রাম্প সম্ভাব্য ইরানি প্রতিশোধাত্মক হামলার মুখে তার স্বভাবসুলভ হম্বিতম্বি চালিয়ে প্রকৃত যুদ্ধ থেকে সরে থাকবেন, যেমন করেছিলেন উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে। প্রক্সি যুদ্ধ চালাবেন ইসরাইলের মাধ্যমে। ইসরাইল ইতিমধ্যে মার্কিন হামলাকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে। ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের যুদ্ধে জড়িত হলে তাতে সহায়তা জোগাবে সৌদি আরব। তাতে ইসরাইলের কোনো বড়ো ক্ষতি না হোক, সৌদি আরবে বর্তমান রাজতন্ত্রের পতন অথবা পরিবর্তন ঘটবে। ট্রাম্প ইরানি জেনারেলকে হত্যার পর বলেছেন, তিনি ইরানে রেজিম চেঞ্জ চান না। কিন্তু তার তীব্র অনিচ্ছা সত্ত্বেও এই রেজিম চেঞ্জের ব্যাপারটি সৌদি আরবে ঘটে যেতে পারে। হোয়াইট হাউজে নিজেদের গদি পাকা করার জন্য সাম্প্রতিক আমেরিকায় কয়েকজন প্রেসিডেন্টই সোলেইমান হত্যাকাণ্ডের মতো কাপুরুষোচিত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। কেবল ট্রাম্পকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। ক্লিনটন প্রেসিডেনট থাকাকালে লিবিয়ার গাদ্দাফিকে গোপন হামলায় হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই হামলায় গাদ্দাফি মরতে গিয়েও দৈব অনুপ্রহে বেঁচে যান, কিন্তু তার ছয় বছর বয়সের পালিত শিশুকন্যা নির্মমভাবে মারা যায়। বারাক ওবামার মতো ‘ব্ল্যাক বাট পপুলার’ প্রেসিডেন্ট হোয়াইট হাউজে বসে রাতের অন্ধকারে হামলা চালিয়ে ওসামা বিন লাদেনকে তার স্ত্রী-পুত্রসহ হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পাকিস্তানে এই হামলা চালাতে গিয়ে পাকিস্তানকেও আগাম খবর দেওয়া হয়নি।
ওসামা বিন লাদেন তবু বিশ্বত্রাস সন্ত্রাসী ছিলেন। কিন্তু ইরানের সোলেইমানি তো সন্ত্রাসী নন। তিনি ইরানের সামরিক বাহিনীর জেনারেল। তাকে হত্যার অধিকার কি আমেরিকার আছে? আমেরিকার অধিকাংশ প্রেসিডেন্টের হাত বৈধ-অবৈধ হত্যাকাণ্ডের রক্তে রঞ্জিত। সিআইএর চক্রান্তে আলেন্দে থেকে শেখ মুজিবসহ অসংখ্য দেশনায়ককে প্রাণ দিতে হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টগণ এই হত্যাকাণ্ডের বিরোধিতা করেননি। ট্রাম্পের মতো হঠকারী প্রেসিডেন্ট তা করবেন কেন? তবে তার সাম্প্রতিক দুর্মতি তার নিজের ঘরেই আগুন জ্বালে কি না, তা দেখার রইল।


সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি