শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০
ফেনীতে এক বছরে ৬৪ ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন
Published : Monday, 20 January, 2020 at 10:05 PM

ফেনী প্রতিনিধি॥ ২০১৯ সালে ফেনীর সোনাগাজীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহানকে মাদরাসার অধ্যক্ষ কর্তৃক যৌন নিপীড়ন ও পরে অধ্যক্ষের নির্দেশে তার অনুগতরা নুসরাতকে মাদরাসার ছাদে নিয়ে হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনাটি দেশব্যাপি ব্যাপক আলোচিত ঘটনা ছিল। ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদ দোলা আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাতকে তার কক্ষে ডেকে নিয়ে যৌন হয়রানি করেন। এ ঘটনায় নুসরাতের মা বাদী হয়ে সোনাগাজী থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০ ধারায় মামলা করেন।
পুলিশ অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠায়। অধ্যক্ষ কারাগারে বসেই তার অনুগতদের দিয়ে নুসরাত ও তার পরিবারকে ভয়ভীতির মাধ্যমে মামলা প্রত্যাহারের চাপ দেয়। এতে রাজী না হওয়ায় ৬ এপ্রিল সকালে নুসরাতকে মাদরাসার ছাদে ডেকে নিয়ে হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। ১০ এপ্রিল রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নুসরাত মারা যায়। এ ঘটনাটি সারাদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। গায়ে আগুনের ঘটনায় প্রথমে হত্যা চেষ্টার মামলা হলেও মৃত্যুর পর সেটি হত্যা মামলায় পরিনত হয়। ওই হত্যা মামলায় ২৪ অক্টোবর মাদরাসার অধ্যক্ষসহ ১৬ জন আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে আদালত। আসামিরা কারাগারে রয়েছেন। কিন্তু অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের মামলাটি এখনো আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
ফেনী জেলায় গত এক বছরে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ৬৪টি ঘটনার অভিযোগে বিভিন্ন থানায় মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের ঘটনায় ৩৭টি মামলা এবং যৌন নিপীড়নের ঘটনায় ২৬টি মামলা হয়েছে। যৌতুকের জন্য খুনের ঘটনায় মামলা ১টি।
বাংলাদেশ মানবাধিকার সম্মিলন ফেনীর চেয়ারম্যান ও আইনজীবী জাহাঙ্গীর আলম নান্টু বলেন, ধর্ষণের সব ঘটনায় মামলা হয় না। নানা সামাজিক ও পারিবারিক কারনে অনেক ঘটনার কথা প্রকাশ্যে আসে না ও মামলা হয় না। জেলায় ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ঘটনা উদ্বেগজনক। পুলিশের খাতায় মামলার যে হিসেব আছে-প্রকৃত পক্ষে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির ঘটনা আরও অনেক বেশি হবে। গত বছর সারাদেশে এক হাজার ৭০৩ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। এর মধ্যে গণর্ষণের শিকার হয় ২৩৭জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ৭৭ জনকে। ধর্ষণের ঘটনায় আত্মহত্যা করে ১৯ জন। বছরটিতে ২৪৫ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। আর বছরটিতে ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয় চার হাজার ৬২২ জন নারী ও শিশু। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ গত বছরের নির্যাতনের এ তথ্য প্রকাশ করে।
এছাড়া গত এক বছরে জেলায় নারী ও শিশু অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ৩৭টি, যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ২৮টি। জেলায় নারী ও শিশু নিখোঁজের ঘটনায় বিভিন্ন থানায় ১৫টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) রুজু করা হয়। ২০১৯ সালে সব মিলিয়ে ফেনী জেলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মোট ১২৯টি মামলা হয়েছে। ২০১৮ সালে জেলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ১৭৬টি মামলা হয়েছিল।
সংশ্লিষ্ট সুত্র জানায়, গত এক বছরে ধর্ষণের ঘটনায় জেলার দাগনভূঞা থানায় ৯টি, সোনাগাজী থানায় ৯ টি, ফেনী সদর থানায় ৭টি, ছাগলনাইয়ায় ৬টি, পরশুরাম থানায় ৪টি এবং ফুলগাজী থানায় ২টি মামলা হয়েছে। গত এক বছরে যৌন নিপীড়নের ঘটনায় জেলার ছাগলনাইয়া থানায় ৬টি, ফেনী সদর থানায় ৫টি, দাগনভূঁঞা থানায় ৪টি, সোনাগাজী থানায় ৫টি, পরশুরাম থানায় ৩টি এবং ফুলগাজী থানায় ৩টি মামলা হয়েছে। গত এক বছরে অপহরণের ঘটনায় জেলার ফেনী সদর থানায় ১৪টি, ছাগলনাইয়া থানায় ৭টি, সোনাগাজী থানায় ৬টি, পরশুরাম থানায় ৩টি, দাগনভূঁঞা থানায় ৩টি এবং ফুলগাজী থানায় ৪টি মামলা হয়েছে। সব ভিকটিম উদ্ধার হয়েছে। গত এক বছরে নারী নির্যাতন ও যৌতুকের ঘটনায় জেলার ফুলগাজী থানায় ৮টি, ফেনী সদর থানায় ৬টি, দাগনভূঁঞা থানায় ৪টি, সোনাগাজী থানায় ৪টি, ছাগলনাইয়া থানায় ৪টি, পরশুরাম থানায় ২টি মামলা হয়েছে। ১২৯টি মামলায় ৩০৫ জনকে আসামী করা হয়েছে এবং পুলিশসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ২২২ জন আসামীকে গ্রেপ্তার করেছে।
ফেনী জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক রনজিত কুমার বড়–য়া বলেন, নিখোঁজের ঘটনায় বিভিন্ন থানায় রুজুকৃত নারী সংক্রান্তে মামলা ও জিডির সুত্র ধরে জেলা পুলিশ সুপারের নির্দেশনা অনুযায়ী অধিকাংশ ভিকটিমকে উদ্ধার ও আসামীদেরকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা থেকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি পুলিশ। বিভিন্ন থানার পুলিশ ও ডিবি পুলিশের তাৎক্ষনিক তৎপরতার কারণে ২০১৮ সালের তুলনায় জেলায় নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা কিছুটা হলেও কমেছে।
ফেনীর পুলিশ সুপার খোন্দকার নুরুন্নবী জানান, ফেনীতে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় থানায় মামলা, জিডিসহ অভিযোগ পেলেই আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা তাৎক্ষনিকভাবে তৎপর হয়ে ওঠেন। যে কারণে প্রায় সব গুলি ঘটনায় ভিকটিম উদ্ধার এবং আসামীদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে।
২০১৯ সালে দেশব্যাপি সবচেয়ে বেশি আলোচিত ঘটনা ছিল সোনাগাজীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহানকে যৌন নিপীড়ন ও পরে হাত-পা বেধে পুড়িয়ে হত্যা। ওই হত্যা মামলায় মাদরাসার অধ্যক্ষসহ ১৬ জন আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে আদালত। আসামিরা কারাগারে রয়েছেন। কিন্তু যৌন নিপীড়নের মামলাটি এখনও আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
অপরদিকে দাগনভূঞায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন প্রধান শিক্ষক তার বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির ছাত্রী ধর্ষণের মামলায় কারাগারে রয়েছেন। ফেনী সদর ও দাগনভূঞার দু’জন মাদরাসা শিক্ষক শিশু শিক্ষার্থী বলাৎকারের অভিযোগে এবং ছাগলনাইয়া অপর এক মাদরাসা শিক্ষক শিশু ছাত্রী ধর্ষণের অভিযোগে কারাগারে আছেন।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় নানা শ্রেণিপেশার মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের সব ঘটনায় থানায় মামলা হয় না। তার প্রধান কারণ সামাজিক অবস্থান। অনেকেই বিষয়টিকে চাপিয়ে যেতে চায়-মেয়েদের বিয়ের কথা বিবেচনা করে। যে ঘটনাগুলি এলাকায় বেশি জানাজানি হয়, সেগুলো থানায় মামলা করা হয়।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ফেনী জেলা সভাপতি, বিশিষ্ট আইনজীবী লক্ষন বনিক বলেন, সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি বেড়েছে। অনেক পরিবার আত্মসম্মানের কথা বিবেচনা করে এসব ঘটনা প্রকাশ বা থানায় মামলা করে না। সব ঘটনায় থানায় মামলা হলে মামলার সংখ্যা অনেক বেশি হতো। তিনি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এসব ঘটনার বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।



সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি