রবিবার, ২৯ মার্চ, ২০২০
গার্মেন্টস শিল্পের মতো ওষুধশিল্পেও আমরা বিশ্ববাজারে প্রভাব বিস্তার করতে পারি
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
Published : Sunday, 9 February, 2020 at 8:31 PM

মোহাম্মদ এবাদুল করিম সাহেবের সঙ্গে আমার পরিচয় গত সাধারণ নির্বাচনের আগে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর কেন্দ্র থেকে তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন। তার দাড়িভরা মুখ দেখে ভেবেছিলাম, তাহলে এবার কি আওয়ামী লীগ সব জামায়াতি চেহারার মানুষকে মনোনয়ন দিয়েছে? কেউ কেউ বলেন, ‘ফেস ইজ দ্য ইনডেক্স অব মাইন্ড’। অর্থাত্ মুখচ্ছবিই হচ্ছে মনের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু পরিচয় হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে আমার ভুল ভাঙতে দেরি হয়নি। তার মুখের দাড়িটাই আমাকে বিভ্রান্ত করেছিল। আসলে তার মুখে ছড়িয়ে রয়েছে সারল্য আর চারিত্রিক দৃঢ়তার পরিচয়। তার এলাকা নবীনগরে তিনি এত জনহিতকর কাজ করেছেন যে, জনগণের কাছে তিনি বেজায় প্রিয়। নির্বাচনে অক্লেশে জয়লাভ এই জনপ্রিয়তাই প্রমাণ করে।
আমার আজকের লেখায় তার কথা যে উল্লেখ করেছি, তার একটা কারণ আছে। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। পরে আমি জানতে পারি, তিনি আমাদের ওষুধশিল্পে এবং ওষুধ ব্যবসায়ে যুগান্তর এনেছেন। এ সম্পর্কে আমার কথা বলার আগে, ‘প্রথম আলো’ পত্রিকা গত ৪ ফেব্রুয়ারি তারিখে তার সম্পর্কে কী লিখেছেন সেদিকে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। ‘মোহাম্মদ এবাদুল করিম ওষুধ-বিজ্ঞানী নন। কিন্তু বাংলাদেশের ওষুধে তিনি নতুন মাত্রা যোগ করেছেন; তার প্রতিষ্ঠিত বীকন ফার্মাসিউটিক্যালসের ক্যানসারের ওষুধের মান ভালো দাম কম। ১৩৪টি দেশের রোগীরা এটা ব্যবহার করছেন।’
এবাদুল করিম পত্রিকাটিকে বলেছেন, ‘দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করে এমন উদ্যোগ আমি নিয়েছি।’ পত্রিকাটিতে আরো বলা হয়েছে, ‘দেশে নিবন্ধিত ওষুধ কোম্পানি ২৫৭টি।’ এর মধ্যে চালু আছে ১৯০টির মতো। বীকন তার মধ্যে একটি। বীকনের যাত্রা শুরু ২০০৭ সালে। তারা ক্যানসারের ওষুধ প্রথম বাজারে আনে ২০০৯ সালে। ক্যানসারের ওষুধ তৈরি করে পুরোনো অনেক কোম্পানিকে পেছনে ফেলে বীকন সামনে চলে আসে। ১০ বছরে ক্যানসারের ওষুধে তারা এখন দেশের সেরা। তাদের অবস্থান এখন সংহত হচ্ছে। কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানি ক্যানসারের ওষুধের বাজার দখল করেছিল। এখন তাদের ব্যবসা সঙ্কুচিত হচ্ছে।’
পত্রিকাটির রিপোর্টের পূর্ণ অংশ এখানে উদ্ধৃত করার দরকার নেই। গত দুই বছরে আমি মতিঝিলে বীকনের প্রধান কার্যালয়ে দুই বার গিয়েছি। দুই বারেই এবাদুল করিম সাহেব আমাকে সাদর অভ্যর্থনা জানিয়েছেন। তিনি ব্যবসা করে মুনাফা অর্জনের জন্য ক্যানসারের ওষুধ তৈরিতে উদ্যোগী হননি। বাংলাদেশে দ্রুত ক্যানসার রোগের বিস্তার এবং তার সুযোগ নিয়ে আমেরিকা ও ইউরোপের কোম্পানিগুলোর ওষুধের অবিশ্বাস্য হারে দাম নির্ধারণ এবং গরিব দেশের রোগীদের এই মুনাফাবাজির দৌরাত্ম্য থেকে বাঁচানোর জন্যই তিনি এই ব্যবসায় নেমে আসেন। পারিবারিকভাবেও তিনি ওষুধ ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত।
রোগীরাই এখন বলছেন, ইউরোপ-আমেরিকায় তৈরি ক্যানসারের ওষুধের চাইতে বীকনের ওষুধ মানে ভালো এবং দামেও কম। জানা যায়, ক্যানসারের ওষুধের বাজারের অর্ধেক এখন বীকনের দখলে। আমেরিকার অ্যাস্ট্রো জেনেফা কোম্পানির ফুসফুসের ক্যানসারের ওষুধ টেগ্রিমোর ৮০ মিলিগ্রামের ৩০টি ওষুধের দাম ১০ হাজার মার্কিন ডলার। আর বীকনের ওই একই ওষুধ ট্যাগরিক্সের ৩০টির দাম ৪৫০ মার্কিন ডলার।
ব্যক্তি প্রশংসা করার জন্য এই লেখাটি নয়। আমার আলোচনা বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের পর ওষুধশিল্পের বিস্তার লাভ নিয়ে। সেক্ষেত্রে এবাদুল করিম ও ওবায়দুল করিম দুই ভাইয়ের নাম আসবেই। বিদেশের রোগীদের কাছে সরাসরি ওষুধ পাঠানোর জন্য বীকন গ্লোবাল পেমেন্ট কেয়ার সার্ভিসেস প্রতিষ্ঠা করেছে। এছাড়া তার ক্রমবর্ধমান রফতানির বাজার তো আছেই।
এককালে বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া মহামারির আকারে দেখা দিয়েছিল। অবিভক্ত বাংলায় বছরে ৪০ লাখ লোকের মৃত্যু হতো। এই ম্যালেরিয়া রোগ থেকে নিরাময়ের জন্য দক্ষিণ আমেরিকার জঙ্গলের একধরনের গাছের বাকল দিয়ে কুইনাইন আবিষ্কারের পর আবিষ্কারককে জাতীয় সম্মানে ভূষিত করা হয়েছিল। বর্তমানে সারাবিশ্বেই ক্যানসার একটি জীবনঘাতী রোগ। বাংলাদেশে এই রোগের বিস্তার ক্রমেই বাড়ছে। এই রোগ সম্পূর্ণ ভালো করার কোনো নিশ্চিত ওষুধ এখনো বের হয়নি। রোগকে ঠেকিয়ে রাখার জন্য যেসব ওষুধ বের হয়েছে, তার দাম বাংলাদেশের গরিব রোগীদের নাগালের বাইরে। এদিক থেকে বীকনের কম দামের ওষুধ গরিব রোগীদের কাছে আশীর্বাদের মতো। ধনী-গরিব কাউকে এই রোগ নিস্তার দেয় না। এই দুরারোগ্য রোগে আমরা শহিদ জননী জাহানারা ইমাম, সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকসহ বহু জ্ঞানীগুণীকে হারিয়েছি।
অনেকেই মনে করেন, অতীতে বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া মহামারি ঠেকানোর জন্য যেমন ম্যালেরিয়া ঠেকাও তথা কচুরিপানা ধ্বংসের অভিযান শুরু হয়েছিল, তেমনি ক্যানসার প্রতিরোধে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং পরিবেশ দূষণ থেকে তাদের মুক্ত করার জন্য ছাত্র-শিক্ষক-বিজ্ঞানীদের সমন্বয়ে অভিযান শুরু করা দরকার। ব্রিটিশ-বাংলায় ম্যালেরিয়া মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার পর বাঙালি স্যার গুরুদয়াল বয়স্কাউট গঠন করে ম্যালেরিয়া প্রতিরোধের লক্ষ্যে কচুরিপানা ধ্বংস ও মশক নিধনের অভিযান শুরু করেছিলেন।
আমার মনে আছে, শৈশবে ছাত্র থাকাকালে মশক নিধন অভিযানে যোগ দেওয়া আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক ছিল। সপ্তাহের একদিন একজন শিক্ষকের অধীনে এলাকার খানা-ডোবা-পুকুরে জমে থাকা কচুরিপানা ধ্বংস করার জন্য আমাদের দল বেঁধে বেরুতে হতো। আমাদের কণ্ঠে গান থাকত— ‘আয় কচুরি নাশি’ ম্যালেরিয়া বা আধুনিককালে ডেঙ্গুজ্বর বিতাড়নের জন্য যেমন টার্গেট মশক ধ্বংস, তেমনি ক্যানসার ধ্বংসের জন্য কোনো নির্দিষ্ট টার্গেট নেই। তবু ক্যানসার সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞেরা বলেন, পরিবেশ দূষণ থেকে মুক্ত থাকতে পারলে ক্যানসার থেকে মুক্ত থাকা কিছুটা সম্ভব।
ক্রমাগত পরীক্ষামূলক আণবিক বিস্ফোরণের তেজস্ক্রিয় ছড়িয়ে পড়ার ফলে উন্নত দেশগুলো থেকে শুরু করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও ক্যানসার দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। দূষিত আবহাওয়া ও পরিবেশও ক্যানসার রোগ ছড়ানোর একটি বড়ো কারণ। ঢাকা শহরসহ বাংলাদেশের সবকটি শহরে পলিথিন ব্যাগসহ নানা ধরনের জঞ্জালের যে পাহাড় দেখা যায় (বর্তমানে কিছুটা কমেছে) তা পরিষ্কার করার জন্য বেসরকারি পর্যায়েও অভিযান শুরু করা যেতে পারে। ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতারা যদি লাইসেন্স-পারমিটবাজি ও ক্যাসিনো ব্যবসায়ের দিকে না ঝুঁকে স্যার গুরুদয়ালের মতো ছাত্রদের দ্বারা বয়স্কাউটের মতো গোষ্ঠী গঠন দ্বারা পরিবেশ দূষণমুক্ত পরিচ্ছন্নতার অভিযান শহর ও শহরের বাইরের এলাকায় শুরু করতেন, তাতে ক্যানসার রোগ সমূলে উচ্ছেদ হতো না, তার প্রকোপ অনেক কমে যেত।
ব্রিটিশ আমলে কালা জ্বর (ব্লাক ফিভার) নামে এক ভয়াবহ রোগের বিস্তার ঘটে ছিল। পশ্চিমা ওষুধ প্রতিষ্ঠানও যখন তার প্রতীকারের জন্য ওষুধ বের করতে পারেনি (পরে করেছে) তখন বাংলাদেশে ব্রহ্মচারী নামে এক ব্যক্তি কালা জ্বরের ইনজেকশন বের করে দেশকে এই জ্বরের আতঙ্ক থেকে বাঁচিয়েছিলেন। বর্তমানেও যে চীনা ভাইরাস সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে, তার প্রতিষেধক এখনো তৈরি হয়নি। তৈরি করার চেষ্টা চলছে। তৈরি হলে বীকন ওষুধ প্রতিষ্ঠানের মতো জীবন রক্ষাকারী ওষুধ প্রতিষ্ঠানগুলোই সর্বাগ্রে তা দেশের জনগণের কাছে সুলভ মূল্যে তুলে ধরবে।
ওষুধশিল্পে বাংলাদেশকে স্বনির্ভর করে তোলার জন্য অতীতে আমাদের আয়ুর্বেদ ওষুধ সংস্থাগুলোর অবদান কম নয়। এক্ষেত্রে অধ্যক্ষ যোগেশ বাবুর আয়ুর্বেদীয় ওষুধ প্রতিষ্ঠানসহ অধ্যক্ষ মথুরা বাবুর ঢাকা শক্তি ঔষধালয় এবং চট্টগ্রামের কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের নাম করতে হয়। এই তিনটি ওষুধ প্রতিষ্ঠানই ধ্বংস করেছে পাকিস্তানি হানাদারেরা ১৯৭১ সালে। বর্তমানের বীকন ওষুধ সংস্থা আধুনিক এবং পাশ্চাত্য ওষুধ-বিজ্ঞানের অনুসারী। বীকনের নিজস্ব গবেষণাগার আছে। আশা করা যায়, তারা অদূর ভবিষ্যতে নিজস্ব গবেষণাপ্রসূত ওষুধ তৈরি করবে। তাতে একদিকে দেশের মানুষকে সেবা করা হবে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের প্রসার ঘটবে। আমার ধারণা, বিশ্বের বাজারে বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্পের মতো অদূর ভবিষ্যতে ওষুধশিল্পও প্রাধান্য বিস্তার করবে।
আমি অনুজ প্রতীম খোন্দকার রাশেদুল হকের কাছে এজন্যই কৃতার্থ যে, তিনিই আমাকে বীকনের এবাদুল করিম এমপি এবং গ্রেটোয়েক্সের খালেদ সাহেবের মতো জনকল্যাণে বিশ্বাসী শিল্পপতিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি ঢাকার সব শ্রেণির মানুষের কাছে নবা এই এক নামে পরিচিত। আমার জন্মদিনের অনুষ্ঠানে তার আমন্ত্রণে ২৫-৩০ জন মন্ত্রী, অসংখ্য সচিব এবং দেশের শিল্পী, সাহিত্যিক ও গুণীজনেরা এসে ভিড় করেছেন। আমার আমন্ত্রণে এত গুণীজনের সমাবেশ ঘটত, তা আমি মনে করি না।


সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি