মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল, ২০২০
ভাষার মাসে প্রবাসে বাংলা ভাষার আন্দোলন
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
Published : Sunday, 23 February, 2020 at 9:05 PM

বাংলা ভাষার আন্দোলন বলতে আমরা বোঝাই বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। আসলে এই আন্দোলন হাজার বছরের। সেই সেন রাজাদের আমলে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা বাংলা ভাষাকে রৌরব নরকের ভাষা আখ্যা দিয়ে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছিল এবং বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বাংলা ভাষার নিদর্শন বুকে নিয়ে নেপালে পালিয়ে গিয়ে ভাষাটিকে রক্ষা করেছিলেন। তখন থেকে দেশে-বিদেশে ছোটো-বড়ো সংগ্রাম করে এই ভাষাকে তার অস্তিত্ব রক্ষা করতে হয়েছে বহুবার। বাংলা ভাষার সংগ্রাম হয়েছে, ভারতের অসম (আসাম) রাজ্যে, ঝাড়খন্ড রাজ্যে এবং অধুনা ইউরোপের ব্রিটেনে। বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারি ভাষার মাস। বাংলাদেশে বাংলা রাষ্ট্র ভাষা। ব্রিটেনে চলছে এটাকে কম্যুনিটি ল্যাঙ্গোয়েজ হিসেবে স্বীকৃতি দানসহ এই ভাষা স্কুলে এবং বিশেষ স্কুলে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা চালু রাখার আন্দোলন। লন্ডন শহরের পূর্বাংশে টাওয়ার হ্যামলেটস পাড়ায় বাংলাদেশিদের সংখ্যা সর্বাধিক বিধায় ভাষা আন্দোলন দানা বেঁধেছে এই পাড়াতেই বেশি। এই ইস্ট এন্ড-এ পাঞ্জাবি, হিন্দি, সোমালিয়ান, চীনা, উর্দুসহ ১১টি ভাষাভাষি কমিউনিটির বাস। এই ১১টি ভাষারই অস্তিত্ব ও অধিকার রক্ষার আন্দোলন চলছে ইস্ট এন্ড নামে পরিচিত লন্ডনের পূর্বাংশে। বাংলাদেশিদের বসবাস এবং ব্যবসায়-বাণিজ্যের বিশাল কেন্দ্র হওয়ায় গার্ডিয়ান পত্রিকা এই এলাকার নাম দিয়েছিল বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট, এখন এই এলাকায় নাম বাংলা টাউন। দূর অতীতে লন্ডনের এই অংশে ইহুদিদের বসবাস ছিল। তারা চলে যেতেই বাংলাদেশি বহিরাগতদের সংখ্যা এখানে বাড়তে থাকে এবং বর্তমানে তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ এমনকি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। এই পাড়ায় ব্রিক লেনে এসে দাঁড়ালে মনে হবে নতুন ঢাকার কোনো একটি জায়গায় দাঁড়িয়েছি। বাংলা লেখা সাইনবোর্ডে দোকানপাট ভরা। সর্বত্র বাংলাদেশিদের বিচরণ। ইহুদির সিনাগগগুলো কিনে বাংলাদেশিরা মসজিদে পরিণত করেছে। বঙ্গবন্ধু, কবি নজরুল, হাছনরাজা, জেনারেল ওসমানির নামে স্কুল ও কমিউনিটি সেন্টার স্থাপিত হয়েছে। পূর্ব লন্ডনের হোয়াইট চ্যাপেল এলাকাটি এখন সত্যিকার অর্থেই বাংলা টাউন, প্রবাসী বাংলাদেশি লেখিকা মনিকা আলী এই এলাকা নিয়ে উপন্যাস লিখে তার নাম দিয়েছেন ব্রিক লেন। এই অঞ্চলের বাংলাদেশিরা লেবার পার্টিকে চিরকাল ওয়ার্কিং ক্লাসের পার্টি হিসেবে নিজেদের পার্টি মনে করে এসেছে। এরা লেবার পার্টির অন্যতম নেতা পিটার শোরকে ভোট দিয়ে ৩০ বছর এমপি করে রেখেছিলেন। পিটার শোর ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য ছিলন মৃত্যুকাল পর্যন্ত। তিনি এই এলাকায় বাংলাদেশিদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কাজ করেছেন। তার মৃত্যুর পর এ ধারা পালটে যায়, এখন লেবার পার্টিও বর্ণবৈষম্যের প্রভাবের বাইরে নয়।
লেবার দলের ‘রেড কেন’ নামে পরিচিত প্রগতিশীল রাজনীতিক কেন লিভিংস্টোন গ্রেটার লন্ডন কাউন্সিলের জনপ্রিয় মেয়র থাকাকালে এথনিক মাইনরিটি কমিউনিটিগুলোর আর্থসামাজিক উন্নতির জন্য যে বিরাট আর্থিক গ্রান্ট দানের নীতি গ্রহণ করেন, তাতে বিলাতের বাংলাদেশি কমিউনিটি বিশেষভাবে উপকৃত হয়। পূর্ব লন্ডনে বাংলাদেশি ছেলেমেয়েদের বাংলাভাষা শিক্ষাদানের জন্য এক বাংলাদেশি শিক্ষক নিজের উদ্যোগে একটি বাংলা স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে লেবার পার্টির নেতৃত্ব থাকা সত্ত্বেও সম্ভবত: বর্ণবৈষম্যের কারণেই এই শিক্ষক তাদের সহযোগিতা পেতে ব্যর্থ হন। এমনকি যারা কাউন্সিলে কাউন্সিলার হতে চেয়ে লেবার পার্টির নমিনেশন চাইলেও তাকে তা দেওয়া হয়নি। বাংলাদেশি কমুনিটি লেবার পার্টির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়। নূরুল হক স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়ান এবং কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। সংখ্যালঘুদের ফাইন্যান্সিয়াল গ্রান্ট দানের নীতির ফলে গ্রেটার লন্ডনের মেয়র হিসেবে কেন লিভিংস্টোনবিরাট জনপ্রিয়তার অধিকারী হন এবং পূর্ব লন্ডনে বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্য থেকে একটি শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের আবির্ভাব ঘটে। তাদের উদ্যোগে ‘টাওয়ার হ্যামলেটস পরায় বাংলাভাষা শিক্ষা এবং সংস্কৃতির প্রসারের জন্য বেনথ (বাংলাদেশি’জ এডুকেশনাল নিডস ইন টাওয়ার হ্যামলেটস) সহ বাংলাদেশিদের বহু শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান কাউন্সিলের আর্থিক সাহায্যে গড়ে ওঠে। বাংলা ভাষা শিক্ষাদানের জন্য বহু স্যাটার ডে স্কুলের ব্যবস্থা করা হয়। আশির দশকের গোড়া থেকে এর ফলে বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে নবজাগরণের সূচনা হয়। এবার কাউন্সিলর পদে বহু বাংলাদেশি নির্বাচিত হন (পরবর্তী সময়ে লেবার প্রার্থীকে পরাজিত করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এক বাংলাদেশি বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে ছিলেন)। বাংলাদেশি কমিউনিটির ভেতর থেকে জালাল, সৈয়দ নজরুল, কুমার মোরশেদ, আইয়ুব করম আলী, নূরুদ্দীন আহমদ, সৈয়দ কয়সর, শীলা ঠাকুর প্রমুখ নেতা বেরিয়ে আসেন। বাংলাদেশিরা এখন মেইন স্ট্রিম রাজনীতি, ব্যবসায়-বাণিজ্য সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত। পার্লামেন্টে আছেন তিন নির্বাচিত সদস্য। হাউজ অব লর্ডসে একজন; কিন্তু এই বাংলাদেশি কমিউনিটির দুর্ভাগ্যের সূচনা হয় টোরি প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের শাসনামলের শেষ দিক থেকে। কেন লিভিংস্টোনও তখন লন্ডনের মেয়র পদ থেকে সরে যান। শুরু হয় টোরি সংকারের অর্থনৈতিক কৃচ্ছ্রতার নামে সোশ্যাল সার্ভিসেসগুলো ‘কাট’ করার নীতি গ্রহণ। টনি ব্লেয়ারের নিউ লেবার পার্টির শাসনামলে লেবার পার্টিতে রেসিজমের পুনরাবির্ভাব ঘটেছে বলে অনেকে অভিযোগ করেন। জন বিগ্স এখন টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলর মেয়র পদে দুই দুইবার নির্বাচিত হন সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশিদের ভোটেই; কিন্তু তার আমলেই বাংলা ভাষা শিক্ষাদান পূর্ব লন্ডনে এক মহাসমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। শুধু বাংলা নয়, আরবি, হিন্দি, পাঞ্জাবি, সোমালিয়ান, উর্দুসহ এগারোটি ভাষায় শিক্ষাদান বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার জন্য বাংলাদেশি কমিউনিটিকে আবার যুদ্ধে নামতে হয়েছে। এই সংগ্রাম চালাবার জন্য রাস্তায় বিভিন্ন সংস্থার (শিক্ষক সংস্থাসহ) সমন্বয়ে গ্রান্ট অ্যালায়েন্স তৈরি হয়েছে। তারা আর্থিক কৃচ্ছ্রতার নামে এথনিক মাইনরিটির মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের আধিকার কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ে নেমেছিল। আর্থিক কৃচ্ছ্রতার অজুহাতে এই শিক্ষাদানে বিভিন্ন সংস্থা ও স্যাটারডে ক্লাস ও স্কুলগুলোর গ্রান্ট বন্ধ করার কথা বলা হলেও গ্রান্ট অ্যালায়েন্সের নেতারা তথ্যপ্রমাণসহ দেখিয়ে দিয়েছেন। অনেক অপ্রয়োজনীয় প্রোজেক্টে মেয়র জন বিগস বিপুল অর্থ বরাদ্দ করে চলেছেন। এই অভিযোগ সত্য হলে জন বিগসের বিরুদ্ধে রেসিজমের অভিযোগও সত্য বলে অনেকে হয়তো বিশ্বাস করবেন। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো—বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলনের সময় কবি গোলাম মোস্তফাসহ যেমন কিছু বাঙালি সাহিত্যক ও রাজনীতিক ভাষার দাবিতে সমর্থন না দিয়ে জাতির ধিক্কার কুড়িয়েছিলেন, তেমনি পূর্ব লন্ডনে কাউন্সিলর সাবিনা ও কাউন্সিলর এহতেশামসহ মুষ্টিমেয় কয়েক জন বাংলাদেশি কাউন্সিলর জন বিগসের ভাষাবিরোধী চক্রান্তে যুক্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে আশার কথা—কমিউনিটি নেতাদের পরিচালনায় মাঠে ভাষার দাবিতে আন্দোলন চলছে। অন্যদিকে ড. হান্নান নামক এক কমিউনিটি নেতা জন বিগসের ভাষা শিক্ষাদান নীতির বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা করেছেন। ব্রিটিশ জাস্টিসের সুনাম এখনো বিশ্বময় প্রচারিত। আশা করা যায়, ব্রিটেনে বাংলা ভাষার আন্দোলনও বায়ান্নর একুশে আন্দোলনের মতো জয়ী হবে। 


সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি