মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল, ২০২০
বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন পালন কবে শুরু?
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
Published : Sunday, 1 March, 2020 at 8:06 PM

দেশে-বিদেশে যখন মুজিববর্ষ পালিত হচ্ছে এবং আগামী ১৭ মার্চ যখন পালিত হতে যাচ্ছে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী, তখন কেউ কেউ আমাকে জিজ্ঞাসা করেছেন, বঙ্গবন্ধু হওয়ার আগে তিনি যখন ছাত্রলীগ নেতা বা আওয়ামী লীগের যুবনেতা, তখন তার জন্মদিন পারিবারিকভাবে অথবা পাবলিকলি পালিত হতো কি না! স্বীকার করতে লজ্জা নেই, এ ব্যাপারে আমার জানাশোনা খুব কম। পারিবারিক বা দলীয়ভাবে তার জন্মদিবস কবে থেকে পালন শুরু হয়, তা আমার জানা নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা এটা সম্ভবত জানেন এবং ভালো বলতে পারেন।
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৪৯ সালের মার্চ মাসে। তখন রাষ্ট্রভাষা দিবস ছিল ১১ মার্চ। ছাত্রলীগ তখন দ্বিধাবিভক্ত ছিল। একটি মুসলিম লীগ সরকারের সমর্থক। নেতা ছিলেন শাহ আজিজুর রহমান। অন্যটি মুসলিম লীগবিরোধী অর্থাৎ তখনকার সরকারবিরোধী ছাত্রলীগ—নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। তখনো আওয়ামী লীগের জন্ম হয়নি। বরিশালে সরকার-সমর্থক ছাত্রলীগের স্ট্রং হোল্ড ছিল। নেতা ছিলেন মহিউদ্দীন আহমদ (পরে ন্যাপ এবং আরো পরে আওয়ামী লীগে যোগ দেন)। তিনি শাহ আজিজের ব্যক্তিগত বন্ধুও ছিলেন। বরিশালে ১১ মার্চের ভাষা দিবস উদ্যাপনের বিরাট ব্যবস্থা হয়। শাহ আজিজ তা জানতে পেরে সরকার-সমর্থক ছাত্রলীগ যাতে সেই দিবস পালনে যোগ না দেয়, সেই ব্যবস্থা করার জন্য বরিশালে আসেন।
শাহ আজিজ বরিশাল থেকে চলে যান ৭ মার্চ (৪৯)। যতদূর মনে পড়ে শেখ মুজিব মার্চ মাসের ৮ কি ৯ তারিখে বরিশালে আসেন। তখন তিনি বঙ্গবন্ধু নন। ছিলেন মুজিব ভাই। বরিশালে মুজিব-অনুসারী ছাত্রলীগ নেতা ছিলেন বাহাউদ্দীন আহমদ এবং শামসুল হক চৌধুরী টেনু মিয়া। বিএম কলেজের একটি হলে শাহ আজিজের বক্তব্য খণ্ডন করে এবং বাংলা ভাষার পক্ষে জোরালো ভাষায় বক্তৃতা দেন মুজিব ভাই। আমি তার বক্তৃতা বরিশালের সাপ্তাহিক নকীব পত্রিকায় ছেপেছিলাম। মুজিব ভাই তাতে খুশি হয়েছিলেন। তার সঙ্গে এই প্রথম আমার পরিচয়। আমার এখন স্মরণ নেই, মুজিব ভাই দুই দিন পরই বরিশাল ত্যাগ করেছিলেন, না সপ্তাহখানেক ছিলেন। সম্ভবত দুই দিন পরই চলে গিয়েছিলেন। আমি ইতিপূর্বে স্মৃতি থেকে তাই লিখেছি। সরকারবিরোধী ছাত্রলীগের জেলা অফিস ছিল বরিশালের সদর রোডের তখনকার দীপালি সিনেমা হলের পাশে দোতলার একটি কক্ষে। একদিন সেই ছাত্রলীগ অফিসে গেছি, দেখি সেখানে বাহাউদ্দীন আহমদ, টেনু চৌধুরী, বিখ্যাত উকিল বি ডি হাবিবুল্লাহ এবং আরো ১০-১২ জন কলেজছাত্র বসা। সবাই মিষ্টি খাচ্ছেন। আমাকে দেখে বাহাউদ্দীন আহমদ (পরে পাসপোর্ট অফিসের জোনাল চিফ হয়েছিলেন) বললেন, এসো এসো মিষ্টি খাও। বরিশালের এ. কে. স্কুলের ছাত্র ছিলাম, তিনি ছিলেন আমার শিক্ষক। তার কথা মান্য করে দুটো রসগোল্লা খেলাম। টেনু চৌধুরী বললেন, আজ শেখ মুজিবের জন্মদিন। ১৭ মার্চ। তাকে আমাদের সঙ্গে থাকতে বলেছিলাম। ঢাকায় জরুরি কাজ থাকায় চলে গেলেন। এই প্রথম আমি জেনেছি, মুজিব ভাইয়ের জন্মদিবস ১৭ মার্চ। সেটা ছিল তার ২৯তম জন্মদিন। তখন মুসলিম মধ্যবিত্ত কেন, উচ্চবিত্ত পরিবারেও জন্মদিন পালনের রেওয়াজ ছিল না। আমাদের পরিবারে তো ছিলই না, বড়ো বড়ো খান সাহেব, খান বাহাদুর খেতাব পাওয়া পরিবারেও জন্মদিন পালন হতে দেখিনি। মৃত্যুদিবস পালিত হতো, তাও সীমাবদ্ধ ছিল কোরআন পাঠ, মিলাদ অনুষ্ঠান এবং গরিবদের ভোজনের ব্যবস্থার মধ্যে। সম্ভবত সে কারণেই আবদুর রব সেরনিয়াবাত কিছুক্ষণ পর সেখানে এসে সকলকে মিষ্টি খেতে দেখে এবং তার কারণ জেনে বললেন, তোমরা কি আবার শেখ মুজিবের জন্মদিন পালন করতে শুরু করেছ নাকি?
সে সময় ফজলুল হক, শহীদ সোহরাওয়ার্দীরও জন্মদিন পালিত হতো না। তারা তখন জীবিত থাকা সত্ত্বেও নয়। সুতরাং আবদুর রব সেরনিয়াবাতের প্রশ্নটি অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। তার প্রশ্নের জবাবে শামসুল হক চৌধুরী টেনু মিয়া কাচুমাচু হয়ে বলেছিলেন, না, আমরা জন্মদিন পালন করছি না। মুজিব ভাই বরিশালে এসেছিলেন। কয়েকটা অনুষ্ঠানেও যোগ দিয়েছেন তাড়াহুড়া করে। তাকে নিয়ে আমরা ভালো করে একটু বসতে পারিনি। এই বসার জন্য একটা উপলক্ষ্য দরকার। সুতরাং তার জন্মদিন পালনের নাম করে আমরা বসব, মিষ্টি খাব ঠিক করেছিলাম। কিন্তু তিনি তো থাকতে পারলেন না। তাই আমরাই মিষ্টি খাচ্ছি। আজ ১৭ মার্চ। ১৯৪৯ সালের ১৭ মার্চ তারিখটা আমার মনে এভাবে গেঁথে গিয়েছিল।
১৯৫০ সালে ম্যাট্রিক পাশ করে ঢাকায় আসি। তখন বখশিবাজারে ইকবাল হল নামে একটি একতলা দালান ছিল। এখানে যারা ছাত্র অথবা যুবনেতা ছিলেন, তারা থাকতেন। তারা আইন অধ্যয়ন করতেন। এদের মধ্যে ছিলেন ইয়ুথ লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ এমাদুল্লা, শাহ আজিজ, মহিউদ্দীন আহমদ। বাইরে থেকে রাজনৈতিক আড্ডা দিতে আসতেন শেখ মুজিব, অলি আহাদ, নুরুদ্দীন আহমদ। যেদিন মুজিব ভাই আসতেন, সেদিন রাজনৈতিক আসর জমে উঠত।ইয়ুথ লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ এমাদুল্লাকে আমি ডাকতাম লালাভাই। লালা তার ডাকনাম ছিল। মুজিব ভাইয়েরও তিনি ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। একদিন ইকবাল হলে মুজিব ভাইয়ের উপস্থিতিতে জোর রাজনৈতিক তর্ক চলছে। পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়নের জন্য মূল বিষয়গুলো নির্ধারণে লিয়াকত সরকার যে কমিটি নিয়োগ করেছিলেন, তার রিপোর্ট বেরিয়েছে। তাতে পাকিস্তানকে ইউনিটারি রাষ্ট্র পদ্ধতিতে রাখার সুপারিশ করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নাগরিক অধিকার ইত্যাদি সর্বক্ষেত্রেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে বৈষম্যের শিকার করা হয়েছিল। এই বঞ্চনা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানে বিরাট আন্দোলন গড়ে ওঠে। এই আন্দোলনের নাম ছিল বেসিক প্রিন্সিপ্যালস কমিটির রিপোর্টবিরোধী আন্দোলন। এই আন্দোলনেরও অন্যতম নেতা ছিলেন মুজিব ভাই। ইকবাল হলের রাজনৈতিক তর্কের আসরে শাহ আজিজের সঙ্গে মুজিব ভাইয়ের জোর তর্কযুদ্ধ হতো পাকিস্তান ইউনিটারি না ফেডারেল স্টেট হবে। বঙ্গবন্ধু বলতেন, আমরা এই সময় ফেডারেল পদ্ধতি চাই। যদিও লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী অবিভক্ত বাংলার একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়া উচিত ছিল। মহিউদ্দীন আহমদ তখন শাহ আজিজের সমর্থক ছিলেন। এমাদুল্লা ভাই ছিলেন মুজিব ভাইয়ের সমর্থক। ১৯৫৫ সালের কথা। একুশের শহিদ দিবস পালন করতে গিয়ে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩৫ ছাত্রছাত্রী গ্রেফতার হই। তখনকার ছাত্রনেতা আবদুল মোমেন, আবদুল আউয়াল, মোহাম্মদ তোহা এবং আরো অনেকে গ্রেফতার হয়েছিলেন। পরে তাদের ঢাকা সেন্ট্রাল জেল থেকে ময়মনসিংহ জেলে সরিয়ে নেওয়া হয়। এই সময় মুজিব ভাইও জেলে। থাকেন অন্য একটি সেলে। বিকালে তার সঙ্গে আমাদের মাঝে মাঝে দেখা হয়। এই সময় এক ঘণ্টার জন্য জেলের ভেতরে উন্মুক্ত স্থানে আমাদের আনা হতো। মুক্ত আলো-বাতাস সেবনের জন্য। বঙ্গবন্ধুও মাঝে মাঝে আসতেন। আমাদের সাহস জোগাতেন। ১৯৫৫ সালে আমরা ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে বন্দি ছিলাম এক মাস। ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২১ মার্চ। ১৭ মার্চ তারিখটি আমার মনে ছিল। সহবন্দি ছাত্রদের পরামর্শটা দিলাম। মুজিব ভাইকে এই তারিখে একটা সারপ্রাইজ দেব। পরবর্তী জীবনে বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক, তখন আমার সহপাঠী জহির রায়হান আমাকে উৎসাহের সঙ্গে সমর্থন জানালেন। এক ৭০ বছরের বৃদ্ধ কয়েদি (খুনের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত) আমাদের ফাইফরমাস খাটত। এদের জেলে বলা হয় ফালতু। এই ফালতু পাউরুটি আর দুধ-চিনি মিশিয়ে মিষ্টি কেক তৈরি করল। আমরা ব্যাপারটা কাউকে জানতে দিলাম না। সেদিন ছিল ১৭ মার্চ। বিকালে এক ঘণ্টার জন্য সেলের তালা খুলে আমাদের মাঠে নামানো হলো। কিছুক্ষণ পর মুজিব ভাইও এলেন। আমরা চার-পাঁচ জন তাকে জেলের বাগানের ফুল এবং ফালতুর বানানো কেক দিয়ে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালাম। মুজিব ভাই প্রথমে একটু বিস্মিত হলেন। তারপর বললেন, তোরা পাগল। আমরা কি জন্মদিন পালন করি? আমাদের বড়ো বড়ো নেতা হক সাহেব, সোহরাওয়ার্দী সাহেব ও মওলানা ভাসানীরই জন্মদিন পালিত হয় না? আমার আবার কীসের জন্মদিন?
আমরা ছিলাম নাছোড়বান্দা। আমাদের মধ্যে গাইবান্ধার নজরুল ইসলামের (ডা. মনিরুজ্জামানের ছোটো ভাই) গলা ছিল মোটামুটি সুরেলা, সে রবীন্দ্রনাথের ‘লহো অভিনন্দন’ গানটি একটু পালটে গাইল, এভাবে মুজিব ভাইকে নিয়ে জেলে বসে পালন করছি মুজিব ভাইয়ের ৩৫তম জন্মদিবস, অবশ্যই ঘরোয়াভাবে। সেদিন কি জানতাম, মুজিব ভাই একদিন হবেন বঙ্গবন্ধু, জাতির পিতা, রাষ্ট্রের স্থপতি? দেশ জুড়ে তার জন্মশতবর্ষ পালনে উৎসবের বন্যা বইবে? আমরা হব শুধু দর্শক? আজ দুঃখ হয় মুজিব ভাই বেঁচে থাকতে কেন তাকে জিজ্ঞাসা করিনি, তাদের পরিবারে জন্মদিন পালনের রেওয়াজ আছে কি না। পারিবারিকভাবে বাসায় কেক কেটে পরিবার-পরিজন বছর বছর তার জন্মদিন পালন করে কি না? যতদূর মনে হয়, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বেরিয়ে এসে মুজিব ভাই জাতীয় নেতা এবং বঙ্গবন্ধু হওয়ার পর তার জন্মদিন দলীয়ভাবে উদ্যাপন শুরু হয়। তবে তাতে গানবাজনা, আলোকসজ্জা নয়, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও বাঙালিদের অধিকার নিয়ে আলোচনা বৈঠক হতো। বঙ্গবন্ধুকে শুভেচ্ছা জানানো হতো। ১৯৭২ সালে ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন দলীয় ও সরকারিভাবে পালিত হয়। সারা ঢাকা শহর ভেঙে পড়েছিল তাকে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য। ফুলে ফুলে তার শরীর ঢেকে গিয়েছিল। মিষ্টি বিতরণ হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু তাতে খুশি হয়েছিলেন কি? জানি না। তবে গণভবনের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, আপনারা আমাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানান, আমার আপত্তি নেই। কিন্তু এই আতিশয্য ভালো নয়। একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার কাজে আমরা যখন ব্যস্ত, তখন কোনো কারণেই উৎসবের আতিশয্য ও অর্থের অপব্যয় ভালো নয়। এই জন্মদিনের উৎসবের অর্থ আমার গরিব-দুঃখী ভাইদের মুখে হাসি ফোটানোর কাজে লাগানো হলে ভালো হতো। আমার জন্মদিন পালন সার্থক হতো। (দৈনিক বাংলা, ১৮ মার্চ, ১৯৭২)। জানি না, বঙ্গবন্ধু আজ বেঁচে থাকলে তার জন্মশতবর্ষ পালনে এই উচ্ছ্বাস-উৎসবের আধিক্য দেখে কী বলতেন? তার আদর্শকে সামনে না এনে ব্যক্তি মুজিবের ছবি আর স্ট্যাচুতে দেশ ভরে দিলেই কি বিশ্বের এই অসাধারণ মানুষটিকে প্রকৃত শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হবে?


সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি