শুক্রবার, ০৫ জুন, ২০২০
যেভাবে দিন কাটছে পাপিয়ার
হাজারিকা অনলাইন ডেস্ক
Published : Saturday, 28 March, 2020 at 8:03 PM

আমোদ-প্রমোদ আর তরুণীদের দিয়ে অনৈতিক ব্যবসার আয়ে বিলাস-ব্যসনে চলা আলোচিত নারী নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়া এখন নির্জন কারাকক্ষে বন্দি। করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে র‌্যাবের রিমান্ডের মাঝপথে তাকে কাশিমপুর করাগারের হাজতে পাঠানো হয়। দুই দফা ২০ দিনের রিমান্ড শেষে ছোট্ট সেলে নিঃসঙ্গ পাপিয়ার আরও ১০ দিনের রিমান্ডের অপেক্ষা। যুবলীগের এই নেত্রী (পরে বহিষ্কৃত) গ্রেপ্তারের আগে গুলশানের অভিজাত হোটেল ওয়েস্টিনের প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুইট ভাড়া নিয়ে মাসে বিল গুনতেন কোটি টাকা। সব সময় সঙ্গে থাকত সাতজন অল্পবয়সী তরুণী। আর আনাগোনা ছিল সমাজের নানা পর্যায়ের ‘এলিট’ মানুষের।

এখন এই নিঃসঙ্গ জীবনে পাপিয়ার মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই বলে জানান কারা সূত্র। তিনি জানান, জেলে যাওয়ার পর পাপিয়ার সঙ্গে তার পরিবারের কেউ দেখা করতে যায়নি। এখন শুয়ে-বসে কাটছে পাপিয়ার বন্দিজীবন। নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের (বর্তমানে আজীবন বহিষ্কৃত) সাধারণ সম্পাদক শামীমা নূর পাপিয়া গত ২২ ফেব্রুয়ারি স্বামী মফিজুর রহমান সুমন ও দুই সহযোগী সাব্বির খন্দকার ও কাজী তায়্যিবা নূরসহ দেশত্যাগের সময় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হন। ধরা পড়ার পর তাকে দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে তিনটি মামলা করে র‌্যাব। এ ছাড়া মানিলন্ডারিং আইনে আরেকটি মামলা প্রক্রিয়াধীন রেখেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ- সিআইডি।

গ্রেপ্তারের পর তথ্য বেরিয়ে আসে, গুলশানের পাঁচ তারকা হোটেল ওয়েস্টিনের প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুইট সাড়ে ৪ মাস ধরে ভাড়া ছিল পাপিয়ার কাছে। এ সময়ে হোটেলটির কক্ষ ভাড়া, মদের বিল, খাবারের খরচসহ আনুষঙ্গিক মোট বিল হয়েছিল তিন কোটি ২৩ লাখ টাকা। প্রতিদিন হোটেলের বিল বাবদ গড়ে খরচ করেন আড়াই লাখ টাকা। তরুণীদের অনৈতিক ব্যবহার, অস্ত্র, মাদক, চোরাচালান, জাল নোটের কারবার, চাঁদাবাজি, তদবির-বাণিজ্য, জায়গাজমি দখল-বেদখল ও অনৈতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থবিত্তের মালিক হন পাপিয়া ও সুমন দম্পতি।

কাশিমপুর কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, সংবেদনশীল আসামি হওয়ায় পাপিয়াকে রাখা হয়েছে কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের বিশেষ একটি সেলে। তার সঙ্গে আর কোনো বন্দি নেই। দিন-রাত একাকি কাটে ছোট্ট কক্ষের চার দেয়ালে। মাঝে মাঝে বই পড়তে দেখা যায় তাকে। বাকি সময় শুয়ে-বসে আর ঘুমিয়েই কাটান একসময়ের পাঁচতারকা হোটেলের বিলাসী গ্রাহক পাপিয়া। বন্দি সেলে পাপিয়ার কারও সঙ্গে সেভাবে মেলামেশার সুযোগ নেই বলে জানায় কারা সূত্র। তাকে আলাদা রাখা হয়েছে। তিনি (পাপিয়া) নতুন বন্দি হিসেবে এই জেলে এসেছেন। এখনো তার পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ দেখা করতে আসেনি। তাছাড়া করোনাভাইরাসের বিশেষ পরিস্থিতির জন্য আপাতত এই কারাগারের বন্দিদের সঙ্গে আত্মীয়-স্বজনদের দেখা-সাক্ষাৎ বন্ধ রয়েছে।

এত যে অপকর্মে লিপ্ত ছিলেন পাপিয়া, তার মধ্যে কি কোনো অনুশোচনার লক্ষণ দেখা যায়- জানতে চাইলে কারাগার সূত্র জানায়, না, তার মধ্যে কোনো অনুশোচনা বোধ নেই। তবে মাঝেমধ্যে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করেন। বিলাসবহুল চলাচলে অভ্যস্থ পাপিয়া এই বন্দি পরিবেশ মানিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছে বলে জানান।

করোনায় জিজ্ঞাসাবাদ স্থগিত

পাপিয়ার বিরুদ্ধে র‌্যাবের করা তিনটি মামলায় তাকে পাঁচ দিন করে মোট ১৫ দিনের রিমান্ড পায় গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তাকে আবার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য র‌্যাবের আবেদনে আরও ১৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। বর্তমানে মামলাগুলোর তদন্তভার র‌্যাবের হাতে।

গত ১৬ মার্চ পাপিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনে র‌্যাব। কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কায় দেশব্যাপী বিশেষ পরিস্থিতির কারণে পাঁচ দিন জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গত ২০ মার্চ কারাগারে পাঠানো হয় তাকে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার উপপরিচালক মেজর রইসুল আজম বলেন, ‘পাপিয়ার তিনটা মামলায় ১৫ দিন জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছে আদালত। এর মধ্যে একটি মামলায় তাকে পাঁচ দিন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে করোনার কারণে তাকে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বাকি দুটি মামলা ১০ দিন জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, অনৈতিক ও অপরাধকর্মের মাধ্যমে পাপিয়া যেভাবে টাকা কামিয়েছিলেন, তাতে তার মনে হয়েছিল, কেউ তার কিছু করতে পারবে না। পেছন ফিরে তাকানোর সময় শেষ হয়ে গেছে। বার্ষিক কর দিতে হবে ভেবে ব্যাংকেও খুব বেশি টাকা রাখতেন না। হোটেল ওয়েস্টিনে তার সঙ্গে আড্ডা দিতে আসা অনেকের সঙ্গেই পাপিয়া ছবি তুলেছেন। তাছাড়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। পাপিয়ার অপরাধ কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে কারা, আসল সত্য কী, তা উদ্‌ঘাটনের চেষ্টা করছে তদন্তসংশ্লিষ্টরা।

কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের জামিউর (ছদ্মনাম) বলেন, ‘তিনি (পাপিয়া) একটি সেলে আছেন। ওনার সঙ্গে আর কাউকে দেওয়া হয়নি। সাধারণ বন্দির মতো তিনি স্বাভাবিকভাবেই থাকেন।’

পাপিয়া সারা দিন কী করেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কী আর করবে...। মাঝে মাঝে লাইব্রেরি থেকে বই আনেন। কখনো কখনো পড়েন। তিনি সুস্থ আছেন। আমরা তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছি।’

পাপিয়ার কাছ থেকে যা উদ্ধার হয়

র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তারের সময় তার কাছ থেকে পাসপোর্ট, নগদ প্রায় আড়াই লাখ টাকা, জাল টাকা, ১১ হাজার ৪৮১ ইউএস ডলার, ৩০১ ভারতীয় রুপি, ৪২০ শ্রীলঙ্কান রুপি উদ্ধার হয়। এ ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় একটি মামলা করে র‌্যাব।

পরে পাপিয়ার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফার্মগেটের ইন্দিরা রোডের বাসায় অভিযান চালানো হয়। সেখানে একটি অবৈধ অস্ত্র, দুটি পিস্তলের ম্যাগাজিন, ২০ রাউন্ড পিস্তলের গুলি, পাঁচ বোতল বিদেশি মদ, নগদ ৫৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা, পাঁচটি পাসপোর্ট, তিনটি চেক, বিদেশি মুদ্রা, বিভিন্ন ব্যাংকের ১০টি ভিসা ও এটিএম কার্ড জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় শেরেবাংলানগর থানায় পাপিয়া ও তার স্বামীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে দুটি মামলা করে র‌্যাব।

ওয়েস্টিনের মালিকের সঙ্গে সখ্যের ভিডিও

২৩ তলাবিশিষ্ট ঢাকা ওয়েস্টিন হোটেলের লেভেল-২২ এ এক হাজার ৪১১ বর্গফুট জায়গাজুড়ে বিলাসবহুল প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুইট। সেখানে বসে নিজের সাম্রাজ্য চালাতেন যুব মহিলা লীগ নেত্রী (পরে বহিষ্কৃত) শামীমা নূর পাপিয়া। হোটেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সখ্যের সুবাদে দীর্ঘদিন ধরে অসামাজিক কার্যকলাপ চালানো সম্ভব হয়েছে- বলছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পাঁচ তারকা এই হোটেলে বোর্ডারদের প্রতিদিনকার তালিকা সংশ্লিষ্ট থানায় জমা দেয়ার নিয়ম থাকলেও হোটেল কর্তৃপক্ষ তা জমা দেয়নি বলে অভিযোগ।

সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে ওয়েস্টিনের মালিক নূর আলীকেও হোটেলের একটি স্যুইটে পাপিয়াসহ বেশ কয়েকজন তরুণীর সঙ্গে খোশমেজাজে গল্প করতে দেখা যায়। এমনকি পাপিয়ার সঙ্গে রাজনীতি, নির্বাচনসহ নানা বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেন তিনি। হোটেলটির মালিকের সঙ্গে পাপিয়ার পাশের সোফায় হাসিমুখে বসে থাকতে দেখা যায় অল্পবয়সী বেশ কয়েকজন তরুণীকে। তবে এ ব্যাপারে হোটেলটির মালিকের কোনো প্রতিক্রিয়া এখনো গণমাধ্যমে আসেনি।

হোটেলের তিনজনকে চাকরিচ্যুত

পাপিয়ার অসামাজিক কার্যকলাপ চালানোর ঘটনায় ওয়েস্টিনের তিন কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করে কর্তৃপক্ষ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, সেখানে দেশ-বিদেশের তরুণীদের নিয়ে এসে চলছিল নানা অসামাজিক কর্মকাণ্ড। এ নিয়ে হোটেল কর্তৃপক্ষের কোনো বাধা-নিষেধ ছিল না।


সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি