শুক্রবার, ০৫ জুন, ২০২০
ভয়াবহ সময় সামনে, কে করোনাক্রান্ত হবো জানি না, শত্রু মনে করবেন না
খুজিস্তা নূর-ই–নাহারিন (মুন্নি)
Published : Monday, 30 March, 2020 at 8:43 PM

করোনাভাইরাসের নির্মম ট্র্যাজেটিতে পৃথিবীজুড়ে যে ভয়াবহ তান্ডব বয়ে যাচ্ছে, গভীর বেদনা আতঙ্ক গ্রাস করলেও অসহায়ত্ব মেনেই আমরা লড়াই করছি। মহাবিপর্যয়ের মুখে অচল নিস্তব্ধ পৃথিবীতে সব বন্ধ করে মানুষের জীবন রক্ষার লড়াই চলছে। হঠাৎ নেমে আসা প্রকৃতির অভিশাপে বড় বেশি কঠিন সময় পার করতে হচ্ছে আমাদের। মহাশক্তিধর উন্নত আধুনিক ধনাঢ্য রাষ্ট্রগুলো মৃত্যুর মিছিল, লাশের পাহাড়, আর্তনাদ অশ্রুতে আজ ধ্বংসস্তুপের উপর অসহায় বিপন্ন। গোটা মানবজাতি ও পৃথিবী আজ লড়াইয়ের ময়দানে বড় অসহায়। দিশেহারা। এমন আতঙ্ক শত বছরেও আসেনি মানবজাতির জীবনে। এ লড়াইয়ে আজ আমরাও অবতীর্ণ।

আমরা বিপর্যস্ত বিষাদগ্রস্ত সময়ে বিদেশ ফেরত মানুষগুলোকে করোনা ভয়ে যেনো শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করছি আবার তারাও এমন ভাবে নিজেকে আড়াল করছেন যেনো বড় অপরাধী। সত্যি সত্যি অনেক বড় পাপ করে ফেলেছেন।নিয়তির বিধান আসলে যা হবার ছিল তাই হয়েছে। আমরা যেমন প্রস্তুতি রাখিনি তারাও তেমনি সহযোগিতা করেননি। সচেতন হননি। যেনো নিজেদের অজান্তেই অসচেতন আর অসাবধান হয়ে তাদের নিজেদের পরিবারসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানুষের মাঝে করোনার জীবাণু পৌঁছে দিয়েছেন। এখন আর ভুলের হিসেব নিকেশের সময় নয়। এখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমরা একমোহনায় মিলিত হয়ে লড়ছি। যার যা আছে তাই নিয়ে। লড়াইয়ের কোনো বিকল্প নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন এপ্রিলের ১৫ তারিখের ভেতর বুঝা যাবে আসলে কতোটা বিপর্যয় বা ভয়ংকর ছোঁয়াচে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ও প্রানহানির ঘটনা ঘটবে আমাদের দেশে। দেখা যাবে দেশের মানুষ কতোটা ভয়াবহ পরিস্হিতির মুখোমুখি হয়। সরকার সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে নেমেছে। বেসরকারি উদ্যোগও বিস্তৃত হচ্ছে মানবিক ডাকে।

এই মুহূর্তে আমাদের নিজ গৃহে সাবধানতা অবলম্বন করা ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই। পরিচ্চন্নতা, সঙ্গরোধ ও আইসোলেশনে থাকাই উত্তম। বাইরে একদম বের হওয়া না জরুরি প্রয়োজন ছাড়া। তাও বিধি মেনে। প্রেস ব্রিফিংয়ে একাধিকবার আমাদের এ ব্যাপারে সাবধান করা হচ্ছে। যদিও রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইইডিসিআর) সনাক্ত করা রোগীর করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৪৯ জন, মৃত ৫ জন-তাঁর মানে এই নয় আমরা বিপদ সীমার বাইরে আছি। কারণ ছুটির ফাঁদে অনেকেই দূর দূরান্তে অবস্থান করছেন। অনেকেই সর্দি,কাশি, শ্বাস কষ্টের উপসর্গ নিয়ে ডাক্তারের স্মরনাপন্ন হচ্ছেন অনেকে আবার বাড়িতে অবস্থান করে চিকিৎসা নিচ্ছেন, অনেকে আবার জানতেই পারছেন না তিনি করোনাভাইরাস শরীরে বহন করছেন। অনেকে নানা উপসর্গে মারাও যাচ্ছেন।

করোনা আক্রান্ত বেশিরভাগ রোগী যাদের ইমিউনিটি অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো তারা নিজেরাই ফাইট করে ৮ থেকে ৯ দিনের মধ্যেই জয়ী হয় অর্থাৎ সেরে যায়। কিন্তু ২০ % রোগী যারা অন্যান্য রোগেও কিছুটা আক্রান্ত কিংবা নেহায়েতই যাদের কপাল মন্দ তাঁদের ক্ষেত্রে জটিল আকার ধারণ করে। প্রচণ্ড শ্বাস কষ্ট সহ, ডায়রিয়া পানি শূন্যতায় একের পর এক অর্গান ড্যামেজ হয়ে অনেকে মৃত্যুর কাছে হার মানে।

গত কয়েকদিনে দশের বিভিন্ন অঞ্চলে হাসপাতালগুলোতে, বাসা বাড়িতে জ্বর, সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্টসহ মৃত্যুর কথা শুনা যাচ্ছে, যাদের করোনা টেস্ট পর্যন্ত করা না হলেও, করোনা আতংকে তাদের এলাকা গুলোও লক ডাউন করা হচ্ছে। করোনা সন্দেহ হওয়ার সাথে সাথে ওই পরিবারসহ আশে পাশের আরও অনেকগুলো পরিবারকে পুলিশ পাহারায় কোয়ারেন্টিনে রাখা হচ্ছে। পুরো কাজটি করা হচ্ছে জনস্বার্থে। কিন্তু মানুষ ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ছে।

করোনা আক্রান্ত রোগীকে ওই এলাকার লোকজন বিতাড়িত করতে চাইছে, সব হাসপাতাল এবং ডাক্তাররা আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে রোগীর কাছেও আসতে চাইছেন না। আক্রান্ত রোগী মৃত্যুর পর তার কাফন এবং দাফনে জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে বিধায় ওই পরিবার রোগের কথা গোপন করে সকলকে না জানিয়ে তড়িঘড়ি করে কবর দিয়ে দিচ্ছে। এতে করে জানা যাচ্ছে না সঠিক কি কারণে রোগীর মৃত্যু হল।

করোনাভাইরাসের কাছে অসহায় মানুষ। আক্রান্ত হওয়া মানে এই না সে দোষী। শোনা গেছে নওগাঁয় অসহায় বৃদ্ধ পিতা ছেলের জন্য একা চার হাসপাতালে নেওয়ার পরও ছেলেটিকে বাঁচাতে পারেননি। প্রতিটি মৃত্যুতে প্রায় একই কাহিনী। এগিয়ে আসছে না মানুষ।

অনেকে মৃত্যুর পর কাফন এবং দাফন নিয়ে আহাজারি করছেন। মৃত্যুটাকেই যদি মেনে নিতে পারি, কাফন-দাফন আর জানাজা নিয়ে অহেতুক বিচলিত হওয়া কেন। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, শুভানুধ্যায়ী যারা আছেন তারা বাসায় বসেই না হয় দোয়া করলেন। সারা জীবনের মূল হিসাব তো বাস্তবিক অর্থে নিজের কাছেই। অতএব এ নিয়ে কোনো আক্ষেপ নয়। শোনা যায় মহামারীতে যারা মৃত্যুবরণ করেন তাদের মৃত্যু জান্নাতি অর্থাৎ শহীদের মর্যাদাপ্রাপ্ত। শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আমাদের গভীর সমবেদনা।

আমার লেখার উদ্দেশ্য হল অন্যান্য দেশের করোনা বিস্তারের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে আমাদের দেশের জন্য ভয়াবহ কঠিন সময় অপেক্ষা করছে সামনে। সময় বেশি দূরে নয় এই ভয়াবহ আক্রমণে আমি বা আপনি কে আছি বা কে নেই কেউ জানি না। কারও জানা নেই। করোনা আক্রান্ত রোগী ও তাদের পরিবারকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত যেনো না করি। কাফনে জড়ানো মৃতব্যক্তি শ্বাস নেয় না, তার সিক্রেশনও কোথাও থাকে না। দাফন করে দিলে মৃত ব্যক্তির শরীরের সব ভাইরাসও মরে যাবে। তাদের প্রতি যেনো সদয় হই। তাদের সীমাবদ্ধতা কষ্টটাকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করি, পাশে থাকি, নিজেকে সুরক্ষিত রেখে যে যেভাবে পারি চেষ্টা করি সাহায্য করার। পাশে দাঁড়াবার। সময় এখন দুঃসময়, কারও হাত নেই এই বিপদে। পাশে দাঁড়ানোই মানবতা।

লেখক: সম্পাদক, পূর্বপশ্চিম
আরও খবর


সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি