শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২০
ধূসর বর্ণের সাংবাদিকতা সম্পর্কে সাবধান
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
Published : Monday, 24 August, 2020 at 7:49 PM

একুশে আগস্ট ছিল ষোল বছর আগে বাংলাদেশের তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার ওপর ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার স্মরণ দিবস। এই হামলায় বিশ্বের সব দেশের নেতারা বিচলিত হয়েছিলেন এবং শেখ হাসিনা নিশ্চিত মৃত্যু থেকে বেঁচে যাওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করে তার কাছে শুভেচ্ছাবাণী পাঠিয়েছিলেন। এই হামলায় একমাত্র বিচলিত হননি বিএনপি নেতারা এবং তাদের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।

একুশে আগস্ট ছিল ষোল বছর আগে বাংলাদেশের তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার ওপর ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার স্মরণ দিবস। এই হামলায় বিশ্বের সব দেশের নেতারা বিচলিত হয়েছিলেন এবং শেখ হাসিনা নিশ্চিত মৃত্যু থেকে বেঁচে যাওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করে তার কাছে শুভেচ্ছাবাণী পাঠিয়েছিলেন। এই হামলায় একমাত্র বিচলিত হননি বিএনপি নেতারা এবং তাদের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।

কারণ, তিনি জানতেন, এই নৃশংসকাণ্ডের নায়ক তার পুত্র তারেক রহমান, তার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, তার উপদেষ্টা হারিছ চৌধুরী এবং তার সহযোগীরা। এটা আদালতের বিচারেও প্রমাণিত হয়েছে। এই গ্রেনেড হামলার মূল টার্গেট শেখ হাসিনাকে যখন হত্যা করা সম্ভব হয়নি, তখন নিজেদের অপরাধ ঢাকার জন্য বেগম জিয়া চেহারায় কাতরতা মেখে পাকা অভিনেত্রীর মতো শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। শেখ হাসিনা রাজি হননি। শেখ হাসিনা কী করে রাজি হবেন?

যে খালেদা জিয়া পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট তারিখে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ১০ বছরের শিশুপুত্র রাসেল, এক মাসের নববিবাহিত বধূ সুলতানা ও রোজির নির্মম হত্যাকাণ্ডে কিছুমাত্র বিচলিত না হয়ে সেই শোকাবহ দিনটিকে তার মিথ্যা জন্মদিন বানিয়ে প্রতি বছর কেক কেটে, হিন্দি গান বাজিয়ে উৎসবের দিন করেছিলেন, তার হৃদয়ে কিছুমাত্র মমত্ববোধ আছে তা কে বিশ্বাস করবে?

যখনই তার পুত্র জামায়াতিদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দেশের কোনো বুদ্ধিজীবী বা বড় কোনো আওয়ামী নেতাকে হত্যা করেছে, তখনই খালেদা জিয়া বিচলিত হওয়া দূরের কথা, তা নিয়ে ঠাট্টা-পরিহাস করেছেন। আমাদের একজন প্রধান কবি শামসুর রাহমানের ঘরে ঢুকে এক জামায়াতি ঘাতক তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করার চেষ্টা করে। তখন খালেদা জিয়া দেশের প্রধানমন্ত্রী। শামসুর রাহমান তার স্ত্রীর সাহসিকতায় বেঁচে যান। দেশের প্রধান কবির ওপর হামলায় যখন সারা দেশের লোক ক্ষুব্ধ এবং উদ্বিগ্ন, তখন খালেদা জিয়া বিদ্রুপ করে বলেছিলেন, ‘এটা নাটক, আওয়ামী লীগ এই নাটক সাজিয়েছে।’

দেশবরেণ্য বুদ্ধিজীবী হুমায়ুন আজাদ জামায়াতি ঘাতকের ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন এবং শেষ পর্যন্ত তাতে মারা যান। তখনও খালেদা জিয়া বিদ্রুপ করেছেন হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলা নিয়ে। বলেছেন, ‘হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলার নাটক করে আওয়ামী লীগ দেশের মানুষের মনে তাদের জন্য সহানুভূতি সৃষ্টি করতে চায়।’ সবচেয়ে ন্যক্কারজনক মনোভাবের পরিচয় দেখিয়েছেন বিএনপি নেত্রী এবং নেতারা যখন ঘাতকদের গ্রেনেড হামলায় বেগম আইভি রহমানসহ আরও ২৪ জনের নির্মম মৃত্যু হয়। শেখ হাসিনা অল্পের জন্য বেঁচে যান, কিন্তু কানে গুরুতর আঘাত পান।

এই ঘটনায় বেগম খালেদা জিয়া বিচলিত হলে তার এক উপদেষ্টাকে দিয়ে নোংরা অসত্য প্রচার করতে পারতেন না। তার এই উপদেষ্টা একজন সাংবাদিক। তিনি তার সাপ্তাহিক পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে লেখেন, ‘খালেদা জিয়ার বিপরীতে শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা এতটাই নেমে গেছে যে, তা উদ্ধারের জন্য শেষ উপায় হিসেবে হাসিনা নিজেই এই গ্রেনেড হামলা ঘটিয়েছেন, এমনকি নিজেকেও আহত করেছেন।’

তখন এই ঢাহা মিথ্যাটি বিএনপির অনেক নেতার মুখেও শোনা গেছে। আজ ১৬ বছর পরে, আদালতের বিচারে তারেক রহমান দোষী সাব্যস্ত হওয়া সত্ত্বেও বিএনপির এই মিথ্যা প্রচার অব্যাহত রয়েছে। এবারের একুশে আগস্টে বিএনপি নেতা রিজভী সাহেব বলেছেন, ‘একুশে আগস্টের ঘটনা আওয়ামী লীগ নিজেই ঘটিয়েছে তারেক রহমানকে আসামি বানানোর জন্য।’ এমন প্রভুভক্তি আর কার মধ্যে দেখা যায়, আমার সহৃদয় পাঠকরা তা জানেন। বিএনপি যে এক ঠোঁটে দুই বাঁশি বাজাতে পারে তার প্রমাণ রিজভী সাহেবের চাইতে চালাকিতে বড় সেক্রেটারি জেনারেল মির্জা ফখরুল ২১ আগস্ট সম্পর্কে বলেছেন, অন্য কথা। তিনি তার নেত্রীকে ২১ আগস্টের দায়ভার থেকে মুক্ত করার জন্য বলেছেন, ‘২১ আগস্টের হামলার খবর শুনে বেগম জিয়া বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন।’

এই বিচলিত হওয়া কি শেখ হাসিনার প্রাণনাশের আশঙ্কায় কাতর হয়ে পড়া, না তার পুত্র তারেকের ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে বিচলিত হয়ে পড়া তা মির্জা ফখরুল ব্যাখ্যা করেননি। কিন্তু একটি ‘নিরপেক্ষ’ দৈনিকের খবরে বোঝানো হয়েছে, এই হামলার ষড়যন্ত্র খালেদা আগে জানতেন না। পরে জেনে উদ্বিগ্ন (বিচলিত) হয়ে পড়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যা, তার পত্নী, পুত্র, পুত্রবধূ এমনকি দশ বছরের ছেলের হত্যাকাণ্ডেও যিনি বিচলিত না হয়ে জন্মদিনের কেক কেটে উৎসব করেছেন, হুমায়ুন আজাদ, শামস কিবরিয়া, আহসানউল্লাহ মাস্টারের হত্যাকাণ্ডে বিচলিত না হয়ে যিনি তা নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেছেন, তিনি ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শেখ হাসিনার জনসভায় গ্রেনেড হামলায় বিচলিত হয়েছিলেন, একথা কি কোনো পাগলেও বিশ্বাস করবে?

মির্জা ফখরুল চালাক রাজনীতিক। রিজভীর মতো অত মোটা মাথার লোক নন। তিনি হয়তো ভেবেছেন, ২১ আগস্টের পর দীর্ঘ ষোল বছর কেটে গেছে। সাধারণ মানুষের স্মৃতিশক্তি দুর্বল। এতদিনে হয়তো তারা ঘটনাটির সত্য-মিথ্যা ভুলেই গেছে। এই সুযোগে বিএনপির কাঁধ থেকে অপরাধের বোঝাটা নামিয়ে ফেলা যাক। তাই এক বিবৃতি দিয়ে সবাইকে বোঝাতে চেয়েছেন, ২১ আগস্টের ঘটনায় বেগম খালেদা জিয়া খুব বিচলিত বা কাতর হয়ে পড়েছিলেন। বিএনপি তখন ক্ষমতায়। খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী। তিন তিনটি গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট রোজ যায় তার হাতে। অথচ তিনি এতই ‘মাসুম’ যে দেশে কী ঘটছে, তার পুত্র কী ঘটাচ্ছে, তিনি তার কিছুই জানতেন না!

দেশের মানুষকে একেবারে নিরেট বোকা না ঠাওরালে মির্জা ফখরুল এমন উক্তি করতে পারতেন না। তবে ১৫ আগস্ট ও ২১ আগস্ট সম্পর্কে বিএনপি নেতারা তাদের অপরাধ ঢাকা দেয়ার জন্য যেসব অসত্য উক্তি করেন, দেশবাসীর কাছে যেমন তার কোনো গুরুত্ব নেই, তেমনি খবর হিসেবেও এই রেটোরিকের কোনো মূল্য নেই। কিন্তু এই গুরুত্বহীন রেটোরিককেই মহা গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে ঢাকার একমাত্র ‘নিরপেক্ষ’ বাংলা দৈনিকটি। আমি পত্রিকার ২১ আগস্টের অনলাইন ভার্সনটি দেখেছি, তাতে প্রথম পাতায় ফলাও করে (সম্ভবত লিড নিউজ) বড় হরফে ছাপা হয়েছে মির্জা ফখরুলের বক্তব্যটি।

শিরোনাম হল ‘২১ আগস্টের হামলার খবর শুনে বেগম খালেদা জিয়া বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন।’ বলেছেন মির্জা ফখরুল। প্রিন্টেড এডিসনেও এই খবর প্রথম পৃষ্ঠায় ফার্স্ট লিড হয়েছে কিনা জানি না। হওয়াটাই স্বাভাবিক। কথায় বলে মিথ্যার লেজ অনেক লম্বা। খবরটি বিএনপির দিনকাল, বা জামায়াতের সংগ্রাম কিংবা ইনকিলাবেও এমনভাবে ছাপা হলে বিস্মিত হতাম না। কিন্তু খবরটি এতটা গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়েছে দেশের একটি জাতীয় দৈনিকের অনলাইন ভার্সনে। যে পত্রিকার দাবি, তারা নিরপেক্ষ নির্ভীক। অসত্য প্রচার যদি নিরপেক্ষতা ও নির্ভীকতার পরিচয় হয়, তাহলে অবশ্যই পত্রিকাটির দাবি সঠিক।

কিন্তু যতদূর জানি, মির্জা ফখরুলের এই নিত্যদিনের মিথ্যা বাংলাদেশের কোনো দৈনিকেই গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়নি। তাহলে ‘নিরপেক্ষ’ দৈনিক এ কাজটি কেন করল এবং কী উদ্দেশ্যে? উদ্দেশ্যটি স্পষ্ট। তথাকথিত সুশীল সমাজের মুখপত্র বলে পরিচিত পত্রিকাটি জন্মাবধি হাসিনাবিদ্বেষ প্রচার করে আসছে। এদের দাবি, এটা নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা কিন্তু বারবারই প্রমাণিত হয়েছে তাদের এই নিরপেক্ষতা আসলে একটি খোলস। এই খোলসের আড়ালে স্বাধীনতাবিরোধী চক্রকে তারা সাহায্য দিয়ে চলেছেন।

বিএনপি ও জামায়াতের মুখপত্র বলে পরিচিত দিনকাল, সংগ্রাম, মিল্লাত প্রভৃতি কাগজগুলো সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিরোধিতা করতে গিয়ে জনগণের কাছে ধরা পড়েছে এবং জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। কিন্তু নিরপেক্ষতার খোলসে এই দৈনিকটি দীর্ঘকাল ধরে তার পাঠক-জনগণকে ধোঁকা দিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এখন ধীরে ধীরে ধরা পড়ছে। শেখ হাসিনা সরকার দীর্ঘকাল ক্ষমতা থাকায় এই পত্রিকাটি অধুনা ভোল পাল্টিয়েছিল, মনে হচ্ছিল, তারা সত্যি সত্যি নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার দিকে এগোচ্ছে। পরে দেখা গেল তারা নীতি পাল্টায়নি, কৌশল পাল্টিয়েছে মাত্র। দশটা খবর নিরপেক্ষভাবে ছেপে একটা খবরে আওয়ামী লীগকে এমনভাবে আক্রমণ করে যে, পাঠক সাধারণ সেই আক্রমণ এবং অসত্য প্রচারণাকেই সত্য এবং নিরপেক্ষ খবর বলে ধরে নিয়ে বিভ্রান্ত হয়। আওয়ামী লীগ ও হাসিনা-নেতৃত্বকে সঠিকভাবে সমালোচনা করলে কারও আপত্তি নেই।

কিন্তু উদ্দেশ্যমূলক এবং সত্যের সঙ্গে কৌশলে মিথ্যাকে মিশ্রিত করে মিথ্যাটাকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা ক্ষতিকর এবং গোয়েবলসীয় মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছু নয়। গোয়েবলস বলতেন, ‘একটা মিথ্যাকে শতবার বললে তা সত্য হয়ে যায়।’
এই পত্রিকাটিতে প্রথম যেসব প্রগতিশীল ও মুক্তচিন্তার বুদ্ধিজীবী কলাম লিখতেন, তারা পরে পত্রিকাটির স্বরূপ বুঝতে পারেন এবং একে একে এই কাগজে কলাম লেখা বন্ধ করেন।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা এককালে সাদা-কালো দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। অর্থাৎ একটি প্রগতিশীল সাংবাদিকতা এবং অন্যটি প্রতিক্রিয়াশীল সাংবাদিকতা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সাদা ও কালো সাংবাদিকতার মধ্যে একটি ধূসর বর্ণের সাংবাদিকতারও আবির্ভাব হয়েছে। এরা নিজেদের কালোবর্ণ ঢেকে রাখে। মাঝে মাঝে সাদাবর্ণ ধারণ করে এবং মানুষকে বিভ্রান্ত করে। এই ধূসর বর্ণের সাংবাদিকতা সম্পর্কে আমার পাঠকদের সতর্ক করার জন্যই আমার আজকের এই লেখা।
"সূত্র যুগান্তর"


সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি