শনিবার, ১৭ এপ্রিল, 2০২1
ট্রাম্পের ব্যর্থ ক্যু মার্কিন গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
Published : Sunday, 10 January, 2021 at 9:00 PM

আমেরিকায় যা ঘটে গেল, তার বিশ্লেষণ করলে মনে হয় এটা কোনো সাধারণ দাঙ্গা নয়, ক্যাপিটল হিলে উচ্ছৃঙ্খল জনতার আক্রমণ নয়, এটা পরিকল্পিত ক্যুর প্রচেষ্টা। এই ক্যু ঘটাতে চেয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বয়ং। তিনি হামলাকারীদের উসকাচ্ছিলেন। ওয়াশিংটনের পুলিশের একাংশ তার সঙ্গে ছিল। কিন্তু ন্যাশনাল গার্ড ও সেনাবাহিনী ট্রাম্পের সমর্থনে এগিয়ে না আসায় এই ক্যু ঘটানোর প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ব্যর্থ ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত আগামী ২০ জানুয়ারি শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরে রাজি হয়েছেন।

তথাপি তাকে কেউ বিশ্বাস করছে না। এমনকি তার বহু আপনজনও নয়। তাকে দ্বিতীয় দফা ইমপিচমেন্টের কথা উঠেছে। সবচাইতে বড় ভয়, তিনি প্রেসিডেন্ট পদাধিকারবলে সেনাবাহিনীর প্রধানও। ইসরাফিলের বাঁশির মতো তার হাতে নিউক্লিয়ার বোমা টেপার চাবিও। হঠকারিতার বশে ইরান বা উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে এই চাবি টিপলে করোনার মতো দ্বিতীয় বিশ্ব ধ্বংসকারী যে বিপদ ঘনিয়ে আসতে পারে, তা ভেবে আমেরিকার ডেমোক্র্যাট দল এবং ট্রাম্পেরও রিপাবলিকান দলের অধিকাংশ সদস্য উদ্বিগ্ন।

তাই ট্রাম্পের ওপর চাপ দেওয়া হয়েছিল, তিনি যাতে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে হোয়াইট হাউজ ছেড়ে যান। আরেক রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিকসনের বেলায় একই ঘটনা ঘটেছিল। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত হওয়ার পর ইমপিচমেন্টের মুখে নিকসন স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছিলেন। ট্রাম্পের বিরুদ্ধেও এই দ্বিতীয় দফা ইমপিচমেন্টের ব্যবস্থা হচ্ছে। আমেরিকার ইতিহাসে আর কোনো প্রেসিডেন্ট দুবার ইমপিচমেন্টের সম্মুখীন হননি।

কিন্তু ডেনাল্ড ট্রাম্প নির্লজ্জ। সারা বিশ্ব কর্তৃক নিন্দিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছাড়তে নারাজ। তিনি ইমপিচমেন্টের পরোয়া করেন না। ঘোষণা করেছেন, তিনি জো বাইডেনের প্রেসিডেন্ট পদ গ্রহণের অভিষেকে থাকবেন না। আমেরিকার ইতিহাসে এ ঘটনাও এই প্রথম। তিনি দাঙ্গাকারীদের নিন্দা করা দূরের কথা, তাদের দেশপ্রেমিক বলে প্রশংসা করেছেন। বলেছেন, তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’-এর আন্দোলন শুরু হলো মাত্র। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদক নিকোলাস ক্রিসটসও সন্দেহ করেন, ওয়াশিংটনে গত বুধবারের হাঙ্গামা ক্যু ঘটানোর প্রচেষ্টা।

গত বৃহস্পতিবারের নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় তিনি লিখেছেন, ‘আমি বিশ্বের বহু দেশে attempted coups বা ক্যু ঘটানোর চেষ্টার খবর লিখেছি। এবার আমি নিজের দেশে এই ক্যুয়ের প্রচেষ্টার খবর লিখছি। আমেরিকার ইতিহাসে এমন ভয়ংকর ও লজ্জাজনক ঘটনা আর কখনো ঘটেনি।’ ট্রাম্পের এই ব্যর্থ ক্যুয়ের পেছনে উদ্দেশ্য সম্পর্কে অন্য মার্কিন সাংবাদিকেরা লিখেছেন, ট্রাম্প সম্ভবত চেয়েছিলেন নিজের দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করে বা দমনের নামে ইনসারেকসন অ্যাক্ট অনুযায়ী সামরিক বাহিনীকে তলব করে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর বন্ধ করা এবং একই সঙ্গে ইরান বা উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে এমন এক সংকট সৃষ্টি করা, যার সুযোগে তার ক্যু সফল করা যায়। এজন্য তিনি নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেনাপ্রধানদের ডেকে ইরানে বোমাবর্ষণ সম্পর্কে আলোচনা করেছিলেন। তিনি সেনাবাহিনীর চিফ কমান্ডার হওয়া সত্ত্বেও সেনানায়কদের কেউ তার প্রস্তাবে রাজি হননি।

ট্রাম্প যে তার সমর্থক শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যে বিশ্বাসীদের দ্বারা আমেরিকার ইতিহাসে এই প্রথম একটি ক্যু ঘটাতে চেয়েছিলেন, তা মার্কিন মিডিয়া মহলেরও বহু সাংবাদিক বিশ্বাস করেন। ট্রাম্পের বিশাল জনবল আছে। তিনি হয়তো ভেবেছিলেন, জনতা কংগ্রেস ভবন ক্যাপিটল দখলে এগিয়ে গেলে সেনাবাহিনীও তাতে সমর্থন জোগাবে। বাস্তবে ওয়াশিংটন পুলিশের একাংশের সমর্থন ছাড়া তিনি সশস্ত্র বাহিনীর কোনো অংশের সমর্থন পাননি। ফলে তার ক্যু ব্যর্থ হয়ে যায়। ওয়াশিংটন পুলিশের যে অংশ টাম্পের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল, তারাও দাঙ্গাকারীদের প্রশ্রয় দিয়েছে, তার বেশি কিছু করতে পারেনি। অরাজকতা যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন তারা গুলি চালিয়ে ট্রাম্পের কথিত ‘দেশপ্রেমিক’দের চার জনকে হত্যা করে। এখন শোনা যাচ্ছে আহতদের আরেক জনেরও মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া বহু লোককে গ্রেফতার করা হয়েছে। ট্রাম্প সেনাবাহিনীকে চিফ কমান্ডার হিসাবে অর্ডার দিয়ে কোনো অঘটন ঘটাতে পারেন, এই আশঙ্কায় সিনেটের স্পিকার সেনাপ্রধানদের ডেকে বৈঠকে বসেন এবং ট্রাম্পের জামার আস্তিনের নিচে নিউক্লিয়ার অস্ত্র ব্যবহারের যে চাবি আছে তা ব্যবহার করে যাতে আরো বড় সর্বনাশ ঘটানোর সুযোগ না পান, তা নিয়ে আলোচনা করেন। ট্রাম্পের কাছ থেকে তার সব ক্ষমতা হরণের মতো নিউক্লিয়ার অস্ত্রের চাবিও সরিয়ে নেওয়ার কথা আলোচনা করা হয়। কেউ কেউ ভাবছেন, ইম্পিচমেন্ট কার্যকর হলে এর সবটাই হয়। এবারের ইম্পিচমেন্টে রিপাবলিকান পার্টির অধিকাংশ সদস্যও সমর্থন দেবেন আশা করা যায়।

ট্রাম্পের ক্ষমতা ত্যাগের আর মাত্র কয়েক দিন (২০ জানুয়ারি) আছে, সুতরাং ইম্পিচমেন্টের দরকার কী, এটা ভেবে যারা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এখনই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে চান না, তাদের সতর্ক করে দিয়ে এক মার্কিন সাংবাদিক লিখেছেন, ‘ট্রাম্পের মানসিক সুস্থতা সম্পর্কে সন্দেহ রয়েছে। এ অবস্থায় তিনি যে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন, যা হবে করোনার চাইতেও সর্বনাশা।’ এখন এই মুহূর্তে আমেরিকা কে শাসন করছে? হোয়াইট হাউজ? মোটেই নয়। ট্রাম্পের ‘টুইটার’ ব্যবহারের সুবিধাও উক্ত কোম্পানি চিরকালের জন্য প্রত্যাহার করেছে। তাহলে পরোক্ষভাবে দেশ শাসন করছে কি কংগ্রেস ও সিনেট? এই মুহূর্তে তারা একটি ভয়ংকর হামলা থেকে আত্মরক্ষা করে নিজেদের গোছাতে বেশি ব্যস্ত। সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব এখনো আছে। তাহলে পেন্টাগন কি আমেরিকা চালাচ্ছে? তা-ও সম্ভবত শতভাগ সত্য নয়। আমেরিকার ভবিষ্যত্ নির্ধারণ করেছে সেনাবাহিনী। তারা ট্রাম্পের স্বেচ্ছাচারিতাকে এখন পর্যন্ত আমল দেয়নি। আমেরিকান গণতন্ত্র এবারের মতো টিকে গেছে মনে হয়। আমেরিকান গণতন্ত্র টিকলে পশ্চিমা গণতন্ত্রও টিকবে।

সবচাইতে বড় কথা, পশ্চিমা ক্যাপিটালিজমও একটা বড় ধাক্কা থেকে বেঁচে গেল। এখন গণতন্ত্রের খোলসে ভরা যে ধনতন্ত্র কিছুটা হলেও মানবতা ও মানবাধিকারকে স্বীকৃতি দেয়, হিটলারের নািসবাদের মতো গণতন্ত্রের খোলসে ভরা ট্রাম্পের ফ্যাসিবাদ (শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদ) সেটুকু স্বীকৃতিও দেয় না।

সংবিধানের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনে মার্কিন সেনাবাহিনী এখনো অটল। এটা মার্কিন গণতন্ত্রের একটা বড় ভরসা। পশ্চিমা গণতন্ত্রেরও। সাবেক সোভিয়েট ইউনিয়ন ভাঙার জন্য মার্কিন সিআইএ ইয়েলেিসনকে সামনে খাড়া করে যে ক্যু ঘটিয়েছিল, তা সফল হতো না এবং সোভিয়েট ইউনিয়ন ভাঙত না, যদি লালফৌজ মার্কিন ষড়যন্ত্রে সমর্থন না দিত। মস্কোতেও পার্লামেন্ট ভবন অবরুদ্ধ হয়েছিল এবং সোভিয়েট সেনাবাহিনী পার্লামেন্ট ভবনে অবরুদ্ধ সদস্যদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করার জন্য তাদের সব সাপ্লাই রুট কেটে দিয়েছিল। অনাহারি পার্লামেন্ট সদস্যরা আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়েছিল। আফগান যুদ্ধে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে সোভিয়েট ইউনিয়ন অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিল। তখন সোভিয়েট সৈন্যদের বেতন জোগাত আমেরিকা। আমেরিকার নির্দেশ তাই সোভিয়েট সেনাবাহিনী অগ্রাহ্য করতে পারেনি।

বহু বছর আগে মস্কোতে আমেরিকার প্ররোচনায় যে ঘটনা ঘটেছিল; অদৃশ্যের পরিহাস, সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো বর্তমান আমেরিকাতেই। আমেরিকার পার্লামেন্ট ভবন ক্যাপিটল অবরুদ্ধ হয়েছিল। সেই অবরোধে মার্কিন সৈন্য সমর্থন দেয়নি। তারা রাশিয়ান রুবলে বেতন পায় না এবং আমেরিকাও অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়নি। ট্রাম্প মার্কিন গণতন্ত্র তথা পশ্চিমা গণতন্ত্রকে যে প্রচণ্ড ধাক্কা দিলেন, এর প্রতিক্রিয়া এখনই বোঝা যাবে না। বোঝা যাবে আরো পরে। এই ধাক্কা পশ্চিমা ধনতন্ত্রের গায়েও গিয়ে লাগবে। তাছাড়া ট্রাম্প হয়তো নিজে মার্কিন রাজনীতি থেকে সরে যাবেন, কিন্তু যে ট্রাম্পইজম বা শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদের বিষবৃক্ষ তিনি আমেরিকার রাজনীতিতে রোপণ করে গেলেন, তার মহিরুহ হয়ে ওঠা থেকে মার্কিন তথা পশ্চিমা গণতন্ত্র কতটা রক্ষা পাবে তা বলা মুশকিল।
"সূত্র ইত্তেফাক"


সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি