বুধবার, ২৫ মে, 2০২2
বরিশালের ঘটনা কী ইঙ্গিত দেয়?
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
Published : Sunday, 22 August, 2021 at 8:37 PM

বরিশালের সাম্প্রতিক ঘটনাটিকে খুব ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু ঘটনাটি মোটেই ছোট নয়। এটা বাংলাদেশে রাজনৈতিক সরকার ও আমলাতন্ত্রের মধ্যে একটা প্রাথমিক শক্তি পরীক্ষা। নির্বাচিত মেয়র না সরকারের নিযুক্ত নির্বাহী অফিসার বেশি শক্তিশালী এবার সেটা প্রমাণ হবে। নির্বাহী অফিসার এতটাই সাহসী হয়েছেন যে, তিনি মেয়রের বিরুদ্ধে খুনের মামলা দায়ের করেছেন। মেয়রের পক্ষের ওয়ার্ড কমিশনারকে সম্ভবত গ্রেফতার করা হয়েছে। সরকারি অফিসারদের অ্যাসোসিয়েশন অত্যন্ত শক্তভাবে নির্বাহী অফিসারের পক্ষ নিয়েছে। তারা মেয়র ও তার সমর্থক ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দুর্বৃত্ত, গুন্ডা-পান্ডা ইত্যাদি যেসব আপত্তিকর ভাষা ব্যবহার করেছেন, তা পরীমনিকে গ্রেফতারের পর র্যাব অফিসারেরা যেসব আপত্তিকর ভাষা ছড়িয়েছেন তার সমতুল্য। পুলিশ স্টেটে এটা হয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এটা হয় না।

মেয়রের পক্ষে জনমত থাকলে ব্যাপারটা এতটা গড়াত না। কিন্তু তার বিরুদ্ধেও জনমনে অনেক অভিযোগ। অনেকে বলেন, যদিও তিনি শহীদ সেরনিয়াবাত পরিবারের সদস্য, কিন্তু তিনি এবং তার সহযোগীরা বরিশালে ত্রাসের রাজস্ব সৃষ্টি করেছেন—এই অভিযোগ কতটা সঠিক তা জানি না। তবে এ কথা সত্য, রাজনীতিকরা যখন দুর্বল ও নীতিহীন হয়ে পড়ে আমলাতন্ত্র তখনই মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ ডিসিপ্লিনের অভাব এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সম্পূর্ণ আমলাতন্ত্র নির্ভরতার ফলে আজ এই ঘটনাটি ঘটতে পেরেছে। এখন গোজামিল দিয়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়া হতে পারে। কিন্তু ভবিষ্যতে আরো বড় ঘটনা ঘটবে। আমলাতন্ত্র প্রমাণ করবে তারা নির্বাচিত সরকারের চাইতে অনেক বেশি শক্তিশালী।

যতটুকু জানতে পেরেছি, বরিশালের ঘটনার সূত্রপাত খুবই সামান্য ব্যাপার থেকে। শহরের দেওয়ালে লাগানো ১৫ আগস্টের পুরোনো পোস্টারগুলো রাতে সরাতে গেলে নির্বাহী অফিসার পরদিন সকালে কাজটি করতে বলেন। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে তর্কাতর্কি, বচসা, পরিণামে নির্বাহী অফিসারের অভিযোগ অনুযায়ী ছাত্র লীগ ও আওয়ামী লীগ কর্মীদের তার ওপর ও তার বাসভবনে হামলা এবং তারপর গোলাগুলি ইত্যাদি। স্পষ্ট বোঝা যায়, ঘটনাটির উৎস কার কতটা ক্ষমতা তা প্রদর্শনের চেষ্টা থেকে। তবে এজন্য মূল অপরাধী কে বা কারা তা বিচারের দায়িত্ব আদালতের। আদালতে একটি খুন অথবা খুন করার চেষ্টার মামলা হয়েছে। যদি সরকারি হস্তক্ষেপে এই ঘটনা আদালতের বাইরে কোনো সুরাহা না হয় তাহলে আদালতেই বিষয়টি গড়াবে।

বরিশালের এই ঘটনা ইঙ্গিত দেয় আমলাতন্ত্র এখন থেকে আর পিছু হটবে না। তাদের অফিসার অ্যাসোসিয়েশন নির্বাহী অফিসারকে সমর্থন জানাতে গিয়ে নির্বাচিত মেয়র ও তার সমর্থকদের যে ভাষায় গালিগালাজ করেছে তা আপত্তিকর। এই ভাষা ব্যবহারের সাহস তারা কোথায় পেলেন ক্ষমতাসীন দলকে বিষয়টি অনুধাবন করতে হবে। এমন একটি ব্যাপার ঘটেছিল পাকিস্তান আমলে সীমান্ত প্রদেশে। সেখানে তখন মুসলিম লীগ সরকার ক্ষমতায় এবং মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন আবদুল কাইউম খান। তিনি দলের নেতাকর্মীদের কাছে আসতে দিতেন না। প্রদেশের শাসনকার্য চালাতেন আমলাদের দ্বারা এবং আমলাদের পরামর্শে। এক সময় কাইউম খানের ডাক পড়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় যোগদানের। এখন সীমান্ত প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর পদটি শূন্য হবে। প্রচলিত নিয়ম অনযায়ী কাইউম খান তার মন্ত্রিসভার কোনো সিনিয়র সদস্যকে মুখ্যমন্ত্রীর পদে বসিয়ে যাবেন। কিন্তু শক্তিশালী আমলাতন্ত্র তার ওপর চাপ সৃষ্টি করল। তিনি সীমান্ত প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর পদে বসাতে বাধ্য হলেন পুলিশের ইন্সপেক্টার জেনারেল বা আইজিকে। সারা বিশ্ব হতবাক। সম্ভবত বিলাতের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় তখন একটি উপসম্পাদকীয় বেরিয়েছিল ‘পাকিস্তান কোন পথে?’ পাকিস্তান যে স্বৈরতন্ত্রী শাসন-ব্যবস্থার দিকে এগুচ্ছে তখনই তার আভাস পাওয়া গিয়েছিল।

এই আভাস পাওয়া গিয়েছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বাংলাদেশ)। তখন আওয়ামী লীগ প্রদেশে ক্ষমতায় এবং আতাউর রহমান খান মুখ্যমন্ত্রী। তিনি আমলাদের খুবই ভয় করে চলতেন। তার চিফ সেক্রেটারি ছিলেন প্রতাপশালী পাঞ্জাবি অফিসার নিয়াজ মোহাম্মদ খান বা এন এম খান। আতাউর রহমান খান এই চিফ সেক্রেটারিকে তার রুমে ঢুকতে দেখলে উঠে দাঁড়াতেন। এটা নিয়ে ঢাকা সেক্রেটারিয়েটে কানাঘুষা চলত। তখন নিয়ম ছিল প্রাদেশিক স্পোর্টস ফেডারেশনে সভাপতি হতেন প্রদেশের চিফ মিনিস্টার। তিনি ঐ পদের জন্য নির্বাচনে দাঁড়াতেন। তাকে সম্মান জানিয়ে ঐ পদে কেউ তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করত না। কিন্তু সেবার দেখা গেল ঐ পদে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য তার চিফ সেক্রেটারি এন এম খান নির্বাচনে দাঁড়িয়ে গেছেন। এমন সম্ভাবনা দেখা দিল নির্বাচন হলে মুখ্যমন্ত্রী তার চিফ সেক্রেটারির কাছে পরাজিত হবেন।
এই লজ্জা থেকে আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভাকে বাঁচানোর জন্য তৎকালীন ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সংবাদের তৎকালীন সম্পাদক জহুর হোসেন চৌধুরী এবং এন এম খানের বন্ধু আরো কপিতয় ব্যক্তি তাকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর অনুরোধ জানান। অনেক অনুরোধ উপরোধের পর এন এম খান নির্বাচন থেকে তার নাম প্রত্যাহার করেন এবং মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান এবং তার নির্বাচিত মন্ত্রিসভার ইজ্জত রক্ষা পায়।

বর্তমানে আওয়ামী লীগ একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। পাকিস্তানে মুসলিম লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে ধীরে ধীরে আমলানির্ভর হয়ে পড়েছিল। সেই বিপজ্জনক প্রবণতা স্বাধীন বাংলাদেশে বর্তমান আওয়ামী লীগের মধ্যে দেখা দিয়েছে। দলের সাংগঠনিক শক্তি নেই। মন্ত্রীদের চাইতে তাদের সচিবদের ক্ষমতা বেশি। কোনো কোনো মন্ত্রী নাম না বলার শর্ত দিয়ে বলেছেন, সচিবেরা তাদের নির্দেশ মানেন না। তারা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সরাসরি নির্দেশ লাভ করেন। ফলে সচিবেরা মন্ত্রীদের তোয়াক্কা করেন না।
এই অভিযোগ যদি সত্য হয় তাহলে বর্তমান সরকারকে পার্লামেন্টোরি সরকার না বলে প্রেসিডেন্সিয়াল ধরনের সরকার বলতে হয়। তা যদি হয় তাহলে একগুচ্ছ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকে বেতনভাতা দিয়ে রাখার বদলে সরাসরি প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতিতে আমরা চলে যেতে পারি। পার্লামেন্টারি সরকারের মোড়কে প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতির চাইতেও অগ্রহণযোগ্য আমলাতান্ত্রিক সরকার পরিচালনা কেন?
দেশে এখন কোনো বিরোধী রাজনৈতিক দল নেই। বিএনপি ও জামায়তকে একেবারে অস্তিত্বহীন করে তোলা হয়েছে। বাম গণতান্ত্রিক দলগুলোরও অবস্থা একই। এই অবস্থায় আওয়ামী লীগ ভাবতে পারে, তাহলে তাদের আর পায় কে? কিন্তু দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে এই শূন্যতা সৃষ্টি কতটা বিপজ্জনক তা কি আওয়ামী লীগ নেতারা জনেন? তারা কি পুথি সাহিত্যের একটি বিখ্যাত পুথি ‘ছহিবড় সোলেমানিনামা’ কিস্সা পড়েছেন? না পড়ে থাকলে সংক্ষেপে গল্পটা বলছি।
কিং সোলেমান একে একে তার সব প্রতিদ্বন্দ্বী রাজ-রাজড়াদের হত্যা করার পর একদিন একা সিংহাসনে বসে ভাবতে লাগলেন, এখন তার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। তিনি এখন যেমন খুশি তলোয়ার চালাতে ও ঘোরাতে পারেন। তিনি একাই এখন সারা পৃথিবীর রাজা। এ কথা ভাবার সঙ্গে সঙ্গে তিনি সিংহাসনে বসে বনবন করে তার তরবারি চালাতে লাগলেন। হঠাৎ তলোয়ারটি তার কাঁধ স্পর্শ করল। তার মাথা ধড় থেকে আলাদা হয়ে গেল। এখানেই কিস্সা খতম। গণতন্ত্রকে বাঁচাতে হলে রাজনীতিতে বিরোধীদল থাকা অত্যাবশ্যক। না থাকাটা বিপজ্জনক। বিরোধী দল থাকলে সরকারের একটি প্রতিপক্ষ থাকে, সরকারের জবাবদিহিতা থাকে। জবাবদিহিতা ছাড়া যে সরকার শূন্যতার মধ্যে বাস করে মহাশূন্যতাই তাদের গ্রাস করে। বরিশালের ঘটনা কি তারই প্রমাণ নয়? বরিশালের ঘটনাটি সামান্য কিন্তু তার শিক্ষাটি বড়। এই শিক্ষা হলো মন্ত্রীরা জনগণের কল্যাণের জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা করবেন আমলারা তা বিনা দ্বিধায় বাস্তবায়ন করবেন। বরিশালে সামান্য রাস্তা পরিষ্কারের ঘটনা নিয়ে যা ঘটল তা কর্তৃত্ববাদী শক্তির মধ্যে দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ। এটাকে সামান্য ঘটনা না ভেবে সরকার যদি এখনই সতর্ক না হয় এবং আমলা কর্তৃত্ব থেকে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সুসংহত না করেন, তা হলে শক্তিশালী বিরোধী দল ছাড়াই আওয়ামী লীগ বিপজ্জনক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে।


প্রতিষ্ঠাতা বীর মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল হাজারী।   ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: গোলাম কিবরীয়া হাজারী বিটু্।   প্রকাশক: মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী।
সহ সম্পাদক- রুবেল হাসান: ০১৮৩২৯৯২৪১২।  বার্তা সম্পাদক : জসীম উদ্দিন : ০১৭২৪১২৭৫১৬।  সার্কুলেশন ম্যানেজার : আরিফ হোসেন জয়, মোবাইল ঃ ০১৮৪০০৯৮৫২১।  রিপোর্টার: ইফাত হোসেন চৌধুরী: ০১৬৭৭১৫০২৮৭।  রিপোর্টার: নাসির উদ্দিন হাজারী পিটু: ০১৯৭৮৭৬৯৭৪৭।  মফস্বল সম্পাদক: রাসেল: মোবা:০১৭১১০৩২২৪৭   প্রকাশক কর্তৃক ফ্ল্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।  বার্তা, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন বিভাগ: ০২-৪১০২০০৬৪।  ই-মেইল : [email protected], web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি