সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১
পরীমণির জামিন ও হাইকোর্টের ঐতিহাসিক নির্দেশনা
আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী
Published : Saturday, 4 September, 2021 at 7:21 PM

আল্লাহ যা করেন তা ভালোর জন্য করেন। বাংলাদেশে নারী নির্যাতন ও নারীর অবমাননা প্রতিরোধ এক নতুন যুগে প্রবেশ করতে চলেছে। হাইকোর্টের এক নির্দেশ জারির ফলে বাংলাদেশের মানুষের মনে অবশ্যই এই আশা জাগ্রত হবে। বলছিলাম আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্য করেন। পরীমণি জেল খেটেছেন সাতাশ দিন। বিনা বিচারে পুলিশের ঔদ্ধত্যের কারণে এই জেল খাটা অবশ্যই কষ্টকর। কিন্তু তার এই কষ্ট সার্থক হয়েছে পুলিশ ও নিম্ন আদালতের একশ্রেণির বিচারকের সংবিধানবিরোধী কার্যকলাপ উন্মোচনে।

পরীমণি আমার নাতনির বয়সী। তাকে আরও একটি কারণে অভিনন্দন জানাই, বাংলাদেশে বহু নারী কিছু নব্য ধনীর দ্বারা নির্যাতিত হয়েছেন। আত্মসম্মানের ভয়ে তারা মুখ ফুটে কখনও এই সমাজশত্রুদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পাননি। পরীমণি সাহস করে মুখ খুলেছেন এবং এই নব্য ধনীদের বিকৃত রুচির পুরুষতন্ত্র এবং তাদের সহযোগী রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামার সাহস দেখানোর ফলে বাংলাদেশে নারী নির্যাতন বন্ধ করার ক্ষেত্রে পরীমণি এক ইতিহাস সৃষ্টি করে দিলেন। এখন এই সংগ্রামে যোগ দিতে অনেক নারী সাহস পাবেন।

পশ্চিমা দেশে হলিউডের মতো বিখ্যাত ফিল্মি জগতে নারী নির্যাতন চলছিল বছরের পর বছর। বিখ্যাত সব নায়িকা অগাধ অর্থের মালিক ওয়েস্টিনের লালসার শিকারে পরিণত হয়েছেন। কেউ আত্মসম্মান রক্ষার জন্য, কেউ শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবেন না- এই ভয়ে এতদিন মুখ খোলেননি। কেউ কেউ মুখ খুলতে চেয়েছিলেন কিন্তু ওয়েস্টিন তার অর্থবলের সাহায্যে তাদের ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দিয়েছেন। এক নায়িকা বলেছেন, 'ওয়েস্টিনের শয্যাসঙ্গিনী হতে রাজি না হওয়ার পর কোনো ছবিতে অভিনয় করার জন্য আর তাকে ডাকা হয়নি।' আরেক বিখ্যাত নায়িকা বলেছেন, 'তিনি পুলিশের কাছে অভিযোগ নিয়ে গেলেও পুলিশ তাকে পাত্তা দেয়নি।' এরপরই শুরু হয়েছে তার চরিত্র নিয়ে টানাটানি। প্রমাণ করার চেষ্টা হয়েছে অর্থের বিনিময়ে তিনি বহু পুরুষের শয্যাসঙ্গী হয়েছেন।

ওয়েস্টিনের এই নারী শিকারের সহযোগী ছিলেন বহু ধনাঢ্য ব্যক্তি। এমনকি ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্যের নামও তাতে যুক্ত হয়েছে। ওয়েস্টিনের বিরুদ্ধে যে নারী প্রথম মুখ খোলার সাহস দেখান, তাকেও 'রাতের রানী' প্রমাণ করার জন্য ওয়েস্টিন, তার প্রতাপশালী বন্ধুরা, এমনকি একশ্রেণির মিডিয়া পাগল হয়ে উঠেছিল। কিন্তু নারীসমাজের সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে ওয়েস্টিন ও ধনীচক্রের চক্রান্ত সফল হয়নি। হলিউড ও হলিউডের বাইরের রূপসীরা একযোগে '#মি টু' আন্দোলন শুরু করেন। ওয়েস্টিন দু'হাতে টাকা খরচ করেছেন নিজেকে রক্ষা করার জন্য কিন্তু পারেননি। তিনি এখন জেলে।

বাংলাদেশে একশ্রেণির নব্য ধনী এবং তাদের সহযোগী পুলিশের একটি অংশ পরীমণিকে নিয়ে যে খেলা শুরু করেছিল তাকে 'নারী মৃগয়া' বলা চলে। ফেসবুক লাইভে তার 'আমাকে বাঁচাও' এই আর্তধ্বনি 'আমার দরজায় কারা যেন আঘাত করছে, পরিচয় দিচ্ছে না' এই চিৎকার শুনে তার প্রতি আমার সহানুভূতি জন্মে। লন্ডনে বসে আমার কিছুই করার ছিল না। তারপর চোখের সামনেই দেখলাম অভিযান পরিচালনাকারী পুলিশ ও র‌্যাবের বাড়াবাড়ি। হলিউডের ছবিতে দুর্ধর্ষ দস্যু ডাকাত ধরার জন্য প্যারামিলিটারি অভিযান চালায়, সেটারই অভিনয় পরীমণির বাসায় চলছিল বলে মনে হচ্ছিল।

তারপর যা ঘটেছে, তাতে মনে হয়েছে এক তরুণীর ওপর নব্য ধনীতন্ত্র ও রাষ্ট্রযন্ত্রের কেউ কেউ একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সেজন্যই প্রধানমন্ত্রীর কাছে সংবাদপত্রের মাধ্যমে আকুল আবেদন জানিয়েছিলাম- পরীমণিকে তাদের কবল থেকে বাঁচান। পরীমণি তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করেছে বলে এক নব্য ধনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর সাহস দেখিয়েছিলেন। তার সেই সাহস ভেঙে দেওয়ার জন্যই যে এই ভয়ানক অভিযান, তা বুঝতে দেশের বুদ্ধিজীবী শ্রেণির দেরি হয়নি। তারা বাংলাদেশে নারীত্বের এই অবমাননা, মানবতা ও অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। কোনো কোনো আইনজীবী বিনা ফিতে পরীমণির মামলা লড়ার জন্য এগিয়ে আসেন।

পরীমণির বিরুদ্ধে আক্রোশ চরিতার্থ করার যে একটা ষড়যন্ত্র চলছে, এটা দুধের বাচ্চাও বুঝতে পেরেছে। নইলে তাকে বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেপ্তারের পর বারবার রিমান্ডে নেওয়া, তাকে তার আইনজীবী ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গেও দেখা করতে না দেওয়া, সংবিধানবহির্ভূতভাবে তাকে দীর্ঘদিনের জন্য বিচারের আগেই জেলে পাঠানো শুধু দেশের নারীদের মধ্যে নয়, সচেতন পুরুষ সমাজেও ক্রোধ ও বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের বিচারকদের এই জামিন না দেওয়াকে 'সভ্য সমাজের কাজ নয়' বলে মন্তব্য করে তার জামিনের আবেদন শুনানির দিন এগিয়ে আনার নির্দেশ দেন। ফলে নিম্ন আদালত তার জামিন শুনানির দিন এগিয়ে এনে জামিন দিতে বাধ্য হন।

ব্যারিস্টার জেড আই খান পান্না হাইকোর্টের বিচারকদের বলেন, 'সিপাহি বিদ্রোহের সময় বিদ্রোহী সিপাইদের শাস্তি দেওয়ার জন্য ব্রিটিশ সরকার যে আইন করেছিল, সেই আইন পরীমণির ওপর নিম্ন আদালত প্রয়োগ করেছেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে সংবিধান প্রণীত হওয়ায় এই আইন প্রয়োগ করা চলে না। তার বেলায় নিম্ন আদালত সংবিধানবিরোধী কাজ করেছেন। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জেরা করার সময় তার আইনজীবীকেও মক্কেলের সঙ্গে পরামর্শ করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। অথচ একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদেরও জেরা করার সময় তাদের আইনজীবীদের সঙ্গে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। পরীমণির সঙ্গে পুলিশের ব্যবহার যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে ব্যবহারের চাইতেও অত্যন্ত খারাপ ছিল।'

পরীমণির মামলার ক্ষেত্রে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশকে ঐতিহাসিক নির্দেশ বলা চলে। আমি মহামান্য বিচারপতিদের একটি যুগান্তকারী নির্দেশনাদানের জন্য অভিনন্দন জানাই। হাইকোর্টের নির্দেশনার ফলেই পরীমণি সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত জেলে না পচে জামিনে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন। পরীমণিকে গ্রেপ্তারে র‌্যাব ও পুলিশ যে বাড়াবাড়ি করেছে, তাকে জামিন দেওয়ার ব্যাপারে নিম্ন আদালত যে সংবিধানবিরোধী কাজ করেছেন তা হাইকোর্টের নির্দেশনায় বলা হয়েছে।

হাইকোর্ট যে ঐতিহাসিক কাজটি করেছেন তা হলো পরীমণি মামলায় দুই পুলিশ অফিসারকে মামলার নথিপত্রসহ আদালতে তলব করেছেন। পুলিশকে আরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে- তারা যেন পরীমণির বিরুদ্ধে এই মামলা কীভাবে শুরু হয়েছে, কারা করেছে, তার কার্যপ্রণালির সব বিবরণ আদালতে দাখিল করেন; এমনকি পুলিশের গোপন রিপোর্টও। এই নির্দেশনার ফলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে এবং ষড়যন্ত্রকারীরাও আর নিজেদের লুকিয়ে রাখতে পারবে না। পরীমণিকে যেদিন আটক করা হয়, সেদিন তিনি তার বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টার মামলা করেছিলেন। এই মামলার আসামি দম্ভ করে সাংবাদিকদের বলেছিলেন- তিনি এই গ্রেপ্তারেই সন্তুষ্ট নন। পুলিশ আরও ব্যবস্থা না নিলে তিনি নিজেই আরও ব্যবস্থা নেবেন। ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। এখন তিনিই ন্যায়বিচারের কবলমুক্ত হতে পারবেন কিনা, এই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

উচ্চ আদালত আমাদের সংবিধানের রক্ষক। সংবিধান আমাদের নাগরিক অধিকারের সুরক্ষা দিয়েছে। নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে ধরা পড়েছে, আমাদের পুলিশ প্রশাসন এবং নিম্ন আদালতের একশ্রেণির বিচারক সংবিধানের নির্দেশনা মানার ধার ধারেন না। এই ধরনের বিচারকের ব্যাপারেও হাইকোর্ট নজর দিলে দেশে আইনের শাসন সুরক্ষা পেতে পারে। আমি আবারও পরীমণির মামলায় হাইকোর্টের সংশ্নিষ্ট মহামান্য বিচারপতিদের সময়োচিত হস্তক্ষেপ ও নির্দেশনা দানের জন্য আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। উচ্চ আদালত এভাবে সজাগ থাকলে দেশে আইনের শাসনের নামে আইনের ব্যভিচার যে হতে পারে না সে সম্পর্কে আমি নিশ্চিত।

পরীমণির মামলায় দেশের অধিকাংশ বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী, সাংবাদিক, চিকিৎসক এবং আপামর জনসাধারণ যেভাবে সামনে এগিয়ে এসেছেন এবং পরীমণিকে সমর্থন দিয়েছেন, তাতে দেশে নারী নির্যাতন বন্ধ হওয়া এবং নারী মুক্তির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশান্বিত হতে হয়। নারী মুক্তিতে মানবতার সুপ্রতিষ্ঠাও সুনিশ্চিত হবে। আমি জেনেছি, পরীমণির মামলার ব্যাপারে তাকে সমর্থন ও সাহায্য দিতে দেশের অনেক খ্যাতনামা আইনজীবী তাদের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। তাদের মধ্যে আছেন ব্যারিস্টার কামরুল ইসলাম, ব্যারিস্টার পান্না, ব্যারিস্টার তানিয়া এবং আরও অনেকে। বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী টেলিভিশনের বিভিন্ন টক শোতে পরীমণির পক্ষে আইনের জোরালো ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আইন এবং জনমত পরীমণির পক্ষে। এখন দেখা যাক, তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র আর কতদূর গড়ায়।


সম্পাদক : জয়নাল হাজারী: মোবা: ০১৩১২৩৩৩০৮০।  প্রকাশক: মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী।
সহ সম্পাদক- রুবেল হাসান: ০১৮৩২৯৯২৪১২।  বার্তা সম্পাদক : জসীম উদ্দিন : ০১৭২৪১২৭৫১৬।  চীফ রিপোর্টার: ডিবি বৈদ্য: ০১৭৩৬-১৪৯২১০।  সার্কুলেশন ম্যানেজার : আরিফ হোসেন জয়, মোবাইল ঃ ০১৮৪০০৯৮৫২১।  রিপোর্টার: ইফাত হোসেন চৌধুরী: ০১৬৭৭১৫০২৮৭।  রিপোর্টার: নাসির উদ্দিন হাজারী পিটু: ০১৯৭৮৭৬৯৭৪৭।  মফস্বল সম্পাদক: রাসেল: মোবা:০১৭১১০৩২২৪৭   প্রকাশক কর্তৃক ফ্ল্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।  বার্তা, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন বিভাগ: ০২-৪১০২০০৬৪।  ই-মেইল : [email protected], web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি