শুক্রবার, ০৭ আগস্ট, ২০২০
ডিপিডিসির নির্দেশেই ভুতুড়ে বিল
হাজারিকা অনলাইন ডেস্ক
Published : Friday, 31 July, 2020 at 10:05 AM

ঢাকা পাওয়ার ডিস্টিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) আইসিটি বিভাগের নির্দেশেই করোনাকালে বিদ্যুতের ভুতুড়ে বিল করা হয়েছে। এর দায়ে বিভাগটির নির্বাহী পরিচালক শহীদুল ইসলাম ফেঁসে যেতে পারেন। তার নির্দেশেই কোম্পানির প্রতিটি বিভাগের গ্রাহকের ওপর এ অস্বাভাবিক বিল চাপানো হয়। ৮ এপ্রিল এক ইমেইল বার্তায় তিনি কোম্পানির ৩৬ নির্বাহী প্রকৌশলীকে বাড়তি বিল করার নির্দেশ দেন। অথচ নির্দেশদাতা এ কর্মকর্তাকেই করা হয় ভুতুড়ে বিল কেলেঙ্কারির তদন্ত কমিটির প্রধান। একই সঙ্গে এ ঘটনার জন্য কোম্পানির ৩৬ নির্বাহী প্রকৌশলীকে ঢালাওভাবে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছিল।

নোটিশ দেয়া হয়েছিল একজন মৃত প্রকৌশলীকেও। আবার গণমাধ্যমে কথা বলায় ঢাকার আদাবর এলাকার একজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়। জানা গেছে, করোনা সংক্রমণের কারণে মিটার রিডাররা মার্চ-এপ্রিলের বিদ্যুতের বিল করতে গ্রাহকের বাসা-বাড়িতে যাননি। তাই আগের ২ মাসের গড় হিসাব দেখে বিল করার সিদ্ধান্ত দিয়েছিল বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে দেশব্যাপী অস্বাভাবিক বিল করে ডিপিডিসিসহ বিতরণ কোম্পানিগুলো। এ নিয়ে দেশব্যাপী তোলপাড় আর চাঞ্চল্য সৃষ্টি হলে কোম্পানির নির্বাহী পরিচালক (আইসিটি) শহীদুল ইসলামকে প্রধান করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটিই ৪ জুলাই ডিপিডিসির ৩৬ নির্বাহী প্রকৌশলীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। গত সপ্তাহে প্রকৌশলীরা নোটিশের জবাব দিয়েছেন।

৩৬ নির্বাহী প্রকৌশলীর জবাবেই তোলপাড় চলছে বিদ্যুৎ বিভাগসহ সর্বত্র। নোটিশের জবাবে তারা জানিয়েছেন, আইসিটি বিভাগের নির্বাহী পরিচালক শহীদুল ইসলামের নির্দেশেই তারা এ বিল তৈরি করেছেন। ইমেইল বার্তায় তিনিই বলে দিয়েছিলেন বিভিন্ন ক্যাটাগরি ও এলাকা ভেদে কোন গ্রাহকের কি পরিমাণ বিল করতে হবে। তাতে উল্লেখ ছিল- বাসাবো এলাকায় বিল করতে হবে সর্বোচ্চ ৬৬.৬ শতাংশ বাড়িয়ে। এছাড়া মুগদাপাড়ায় ৬১.৭ শতাংশ, বনশ্রীতে ৫৬.৪ শতাংশ, রাজারবাগে ৫১.৮১ শতাংশ, মগবাজারে ৫০.৫৪ শতাংশ বাড়িয়ে বিল করার নির্দেশ দেয়া হয়।

হাতে আসা তার ইমেইল বার্তায় আরও দেখা গেছে- শ্যামপুর এলাকায় সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ, স্বামীবাগে ৪৮ শতাংশ, বংশালে ২৯ শতাংশ, নারায়ণগঞ্জ (পূর্ব) ৩০ শতাংশ, ফতুল্লা ২৫ শতাংশ, নারায়ণগঞ্জ (পশ্চিম) ২৫ শতাংশ, সিদ্ধিরগঞ্জ ৩০ শতাংশ, নারিন্দা ৪০ শতাংশ, মানিকনগর ৩৯.১৩ শতাংশ, জুরাইন ২৯.১১ শতাংশ, ডেমরা ৩১.২৯ শতাংশ, মাতুয়াইল ৩৫.২৭ শতাংশ, কামরাঙ্গীরচর ২৫ শতাংশ, আদাবর ৩০.৬৭ শতাংশ, মতিঝিল ৩১.৮৭ শতাংশ, খিলগাঁও ৪৯.১৩ শতাংশ, লালবাগ ২৫ শতাংশ, পোস্তগোলা ৩৬ শতাংশ, বাংলাবাজার ২৬.৪৫ শতাংশ, তেজগাঁও ৩০.৬৪ শতাংশ, সাতমসজিদ ৪০.১০ শতাংশ, পরিবাগ ২৫.৯৫ শতাংশ, কাকরাইল ২৬.১৪ শতাংশ, ধানমণ্ডি ৪৪.৬২ শতাংশ, রমনা ২৩.৬৬ শতাংশ, শ্যামলী ৪০.১০ শতাংশ, শেরেবাংলা নগর ৫১.৮১ শতাংশ, রাজারবাগ ৪৭.৭১ শতাংশ, জিগাতলা ৩৮.৫৬ শতাংশ ও আজিমপুর এলাকায় সর্বোচ্চ ৪৬.৬৭ শতাংশ বিল বাড়িয়ে করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল।

নোটিশের জবাবে নির্বাহী প্রকৌশলীরা বলেছেন- মার্চের বিল ফেব্রুয়ারি থেকে কতভাগ বেশি করতে হবে তার একটি তালিকা প্রত্যেক নেটওয়ার্ক অপারেশন অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসকে (এনওসি) পাঠানো হয়েছিল। মিটার না দেখে তাদের বিল করতে বলা হয়েছে।
ফলে যেসব গ্রাহক বাসাবাড়িতে ছিলেন না তাদের কাছেও অতিরিক্ত এ বিল চলে গেছে। দোকানপাট এবং অফিস-আদালত বন্ধ থাকলেও তারা নিয়মিত ব্যবহারের অতিরিক্ত বিল পান। তবে মে থেকে আবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে মিটার রিডিং নিয়ে বিল করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত বিলও সমন্বয় করার কথা জানিয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলীরা।

এ প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল প্রতিটি বিতরণ কোম্পানি নিজেরাই তদন্ত করে সেই তদন্ত সাপেক্ষে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু এখন সেই ব্যবস্থায় যদি কোনো ধরনের গরমিল হয় তবে সে ব্যাপারে আবারও তদন্ত হবে। এখন পর্যন্ত তদন্তে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরি হারিয়েছেন এবং যাদের শোকজ করা হয়েছে তা আমাদের জানানো হয়েছে।

ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যেসব অভিযোগ এসেছে সেগুলো যাচাই-বাছাই করতে কোম্পানির নির্বাহী পরিচালক (অর্থ) মো. গোলাম মোস্তফাকে প্রধান করে চার সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। তারা প্রয়োজনে অভিযুক্তদের ডাকবেন, কথা বলবেন, এরপর প্রতিবেদন দেবেন। এরপর আমরা দেখব কি করা যায়। এখনই কিছু বলা সম্ভব হচ্ছে না।

এ বিষয়ে ডিপিডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী (আইসিটি) এমএম শহীদুল ইসলামের সঙ্গে কোনোভাবেই যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। টেলিফোনে চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার অফিসে গেলেও তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ভুতুড়ে বিলের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত কোনো কঠোর ব্যবস্থা না নেয়ায় দেশব্যাপী এ সংকট তৈরি হয়েছে। কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বলেন, ভুতুড়ে বিল কেলেঙ্কারির জন্য এ পর্যন্ত ডিপিডিসিসহ কোনো কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান বোর্ড সদস্য ও প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তিনি বলেন, কেন বোর্ড চেয়ারম্যান ও বোর্ডকে দায়ী করা হবে না। কেন বিইআরসিকে দায়ী করা হবে না। এসব অপরাধ যদি তারা যথাযথ ভাবে তদন্ত করত তাহলে এ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটত না।

ডিপিডিসি সূত্র বলছে, সরকারের নির্দেশে অতিরিক্ত বিলের জন্য দায়ীদের খুঁজে বের করতে তদন্ত কমিটি করেছিল ডিপিডিসি। ওই তদন্ত কমিটির প্রধান ছিলেন ডিপিডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী (আইসিটি) এমএম শহীদুল ইসলাম। ডিপিডিসির নির্বাহী প্রকৌশলীরা শোকজের জবাবে ইমেইলের মাধ্যমে তাদের নির্দেশ দেয়ার বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে সব বলে দিয়েছেন। এককভাবে একজন নির্বাহী পরিচালক এ ধরনের সিদ্ধান্তসহ নির্দেশ দিতে পারেন কিনা তা নিয়েও এখন প্রশ্ন উঠেছে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান প্রধানের সায় থাকারও অভিযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর পর ৩ মাস একটি প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত বিল করল বিষয়টি শীর্ষ পর্যায়ের কেউ দেখলেন না, এটা গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিষ্ঠানটির একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে পাঁচজন নির্বাহী পরিচালক রয়েছেন। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ড. সুলতান আহমেদের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি পরিচালনা পর্ষদ রয়েছে। মাসের পর মাস গ্রাহক হয়রানিমূলক এসব অতিরিক্ত বিলের বিষয়ে কেন পরিচালনা পর্ষদ আগেভাগে কোনো ব্যবস্থা নিল না, সেটিও বড় করে দেখা হচ্ছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, উপরের কর্মকর্তাদের নির্দেশ ছাড়া মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কিছুই করা সম্ভব নয়। আগেই যদি ব্যবস্থা নেয়া হতো তাহলে আজকের এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না। তিনি আরও বলেন, প্রথম থেকেই মাঠের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শোকজ করা হল আর দায়ীদের আড়ালে রেখে দেয়া হয়েছিল। এখনও সময় আছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হোক। বিদ্যুতের অতিরিক্ত বিল : ডিপিডিসি কার্যালয়ে বিইআরসি প্রতিনিধি দল : এদিকে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ সমাধানের বিষয়ে সরেজমিন দেখতে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) কার্যালয় পরিদর্শন করেছেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) প্রতিনিধিরা। সোমবার বিইআরসির উপ-পরিচালক কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ডিপিডিসিতে যায়। এ সময় তারা অতিরিক্ত বিলের বিষয়ে খোঁজ নেন।

ডিপিডিসি সূত্র জানায়, বিইআরসির কর্মকর্তারা ডিপিডিসিকে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নেয়ার ক্ষেত্রে কী সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল সে বিষয়ে খোঁজ নেন। নানা ধরনের কাগজপত্র দেখতে চান। ডিপিডিসির তরফ থেকে সেসব কাগজপত্র দেখানো হয়। বিইআরসির চেয়ারম্যান আবদুল জলিল বলেন, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের বিষয়ে আমরা আগেই কোম্পানিগুলোকে চিঠি দিয়েছিলাম। তাদের কড়া ভাষায় সমাধানের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। এখন তারা কী পদক্ষেপ নিয়েছে তার খোঁজ নেয়া হচ্ছে। তবে অপরাধীদের শাস্তি দেয়া আমাদের কাজ নয়। সে কাজ করবে বিদ্যুৎ বিভাগ।
"সূত্র যুগান্তর"


সম্পাদক : জয়নাল হাজারী।  ফোন : ০২-৯১২২৬৪৯
মোঃ ইব্রাহিম পাটোয়ারী কর্তৃক ফ্যাট নং- এস-১, জেএমসি টাওয়ার, বাড়ি নং-১৮, রোড নং-১৩ (নতুন), সোবহানবাগ, ধানমন্ডি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত
এবং সিটি প্রেস, ইত্তেফাক ভবন, ১/আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত।
আবু রায়হান (বার্তা সম্পাদক) মোবাইল : ০১৯৬০৪৯৫৯৭০ মোবাইল : ০১৯২৮-১৯১২৯১। মো: জসিম উদ্দিন (চীফ রিপোর্টার) মোবাইল : ০১৭২৪১২৭৫১৬।
বার্তা বিভাগ: ৯১২২৪৬৯, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ০১৯৭৬৭০৯৯৭০ ই-মেইল : [email protected], Web : www.hazarikapratidin.com
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি